নাটোর প্রতিনিধি 
রিকশার হ্যান্ডেল ধরে যে হাত একসময় জীবিকার নির্মম সংগ্রাম চালিয়ে যেত, সেই হাতই আজ ঘুরিয়ে দিয়েছে সফলতার চাকা। হাতে ছিল না পর্যাপ্ত পুঁজি, ছিল না আধুনিক অবকাঠামো তৈরির সামর্থ্য। শুধু অদম্য ইচ্ছা আর আত্মবিশ্বাসকে সম্বল করে মাত্র পাঁচটি ছাগল দিয়ে পশুপালনের যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ রূপ নিয়েছে একটি বিশাল খামারে। সংগ্রাম আর কঠোর পরিশ্রমে নিজের ভাগ্য বদলের পাশাপাশি দেশের হাজারো তরুণের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার শাঁখারীপাড়া এলাকার মো. বড় শাহিন। খামারিদের কাছে তিনি এখন এক নামে পরিচিত—‘বড় শাহিন ভাই’।
সংগ্রামের দিন পেরিয়ে সফলতার আলো
একসময় রিকশা চালিয়ে কোনোমতে সংসার চালাতেন শাহিন। কিন্তু মনে ছিল স্বাবলম্বী হওয়ার তীব্র আকুতি। বড় কোনো মূলধন না থাকায় পাঁচটি ছাগল কিনে শুরু করেন খামার। রাতদিন পশুর পরিচর্যা, ধৈর্য ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তাকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যায়। পশুপালনে অভিজ্ঞতা বাড়ার পর নিজের জমানো টাকা আর অদম্য সাহসে প্রতিষ্ঠা করেন ‘হাই কোয়ালিটি ছাগল ফার্ম’। সময়ের ব্যবধানে নলডাঙ্গার এই ফার্মটি এখন উন্নত জাতের ছাগল ও ভেড়ার একটি আস্থাশীল ও প্রধান সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।
৬৪ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে সুনাম
শাহিনের এই খামারে শুধু স্থানীয় খামারিরাই নন, ছাগল ও ভেড়া কিনতে ছুটে আসছেন দেশের বিভিন্ন জেলার উদ্যোক্তারা। দুগ্ধজাত ছাগল, খাসি ও ভেড়া পাইকারি ও খুচরা মূল্যে বিক্রির পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তাদের বিনামূল্যে খামার ব্যবস্থাপনা, সঠিক খাদ্য নির্বাচন ও পরিচর্যার পরামর্শ দিয়ে থাকেন তিনি।
মো. বড় শাহিন বলেন,
”আমার মূল লক্ষ্য ব্যবসা করা নয়, বরং নতুন খামারিদের কাছে সুলভ ও সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত জাতের পশু পৌঁছে দেওয়া। একটি নতুন খামার কীভাবে দাঁড় করাতে হয়, কীভাবে রোগের বিরুদ্ধে যত্ন নিতে হয়—আমি সেগুলো শেখোনোর চেষ্টা করি। আজ ৬৪ জেলার উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ রয়েছে। আমার হাত ধরে কেউ সফল হলে নিজের কষ্ট সার্থক মনে হয়।”
আস্থার ঠিকানা ‘হাই কোয়ালিটি ছাগল ফার্ম’
খামারে ছাগল কিনতে আসা আব্দুল হামিদ নামে এক ক্রেতা জানান, সঠিক ও উন্নত জাতের পশু খুঁজে পাওয়া নতুনদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। শাহিন ভাইয়ের খামারে সাশ্রয়ী দামে ভালো পশু পাওয়ার পাশাপাশি যে পরামর্শ পাওয়া যায়, তা খামার চালনায় বড় ভূমিকা রাখে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের প্রশাসনিক সাধুবাদ
নলডাঙ্গা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রকিবুল হাসান সুজন উদ্যোক্তা শাহিনের প্রশংসায় বলেন,
”উন্নত জাতের ছাগল ও ভেড়া পালনের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। সঠিক জাত নির্বাচন, সুষম খাবার ও নিয়মিত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে এটি অত্যন্ত লাভজনক খাত। প্রাণিসম্পদ বিভাগের সঠিক নির্দেশনা নিয়ে শাহিনের মতো উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে দেশে বেকারত্ব দূরীকরণে তা অনন্য ভূমিকা রাখবে।”
ছোট্ট পুঁজি ও অদম্য ইচ্ছা থাকলে যে শূন্য থেকেও সফলতার শিখরে পৌঁছানো সম্ভব, তার জ্বলন্ত প্রমাণ নাটোরের বড় শাহিন। রিকশার হ্যান্ডেল ছেড়ে আজ তিনি নিজেই তৈরি করছেন শত শত মানুষের কর্মসংস্থান। ‘হাই কোয়ালিটি ছাগল ফার্ম’ এখন কেবল পশু বিক্রির কেন্দ্র নয়, বরং নতুন উদ্যোক্তাদের স্বপ্নের সূচনা কেন্দ্র।
মন্তব্য করুন