স্পোর্টস ডেস্ক 

২৩ এপ্রিল, ২০১৭। লা লিগা তখন জমজমাট মেসি-রোনালদো ‘রাইভালরি’ নিয়ে। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ম্যাচ। সারা পৃথিবীর ফুটবল প্রেমীদের নজর তখন এল-ক্লাসিকোতে।
ম্যাচটি ছিলো মেসি’র। ম্যাচের ২৮ মিনিটে, কাসেমিরো গোল করে রিয়ালের জন্য লিড এনে দেন। ঠিক ৫ মিনিট পর দানি কারভাহালকে ‘ডজ’ করে ক্লাসিক গোল মেসির। তখন-ও মেসি শো’ বাকি।
এরপর ৭৩ মিনিটে ইভান রাকিটিচ গোল করে কাতালানরা লিড নেয়। তবে, লিড বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেনি বার্সা। মাদ্রিদের হয়ে ম্যাচের ৮৫ মিনিটে গোল করেন কলম্বিয়ান স্টার হামেস রদ্রিগেজ। গোল স্কোর ২-২।
ম্যাচের বাকি আর ৩০ সেকেন্ড। সবাই ধরেই নিয়েছে এই ক্লাসিকো ড্র হবে। কিন্তু, মেসি হ্যাড অ্যানাদার প্ল্যান।
নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা শেষ হলে রেফারি অতিরিক্ত ২ মিনিট সময় দেন। ২ মিনিটের মধ্যে দেড় মিনিট শেষ। বল বার্সার ডিফেন্স লাইনে।
সেখান থেকে শুরু ‘বিল্ড আপ অ্যান্ড কাউন্টার-অ্যাটাক’। ৯১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড থেকে শুরু সেই অ্যাটাক মাত্র ২১ সেকেন্ডের মধ্যে গোলে পরিণত করেন মহাতারকা মেসি। ওই গোল এখনও ‘অবিশ্বাস্য-ইনএভিটেবল-ম্যাজিকাল’।
ওই ম্যাচটি শুধু প্লেয়ারদের ক্লাসিকো ছিলো না। বরং ম্যানেজারদেরও ক্লাসিকো ছিল। বিশেষকরে, জিনেদিন জিদান ভার্সেস লুইস এনরিকে।
এরপর ২০২৬। অনেককিছু বদলে গেছে। ‘২২ কাতার বিশ্বকাপ। ম্যারাডোনা অ্যান্ড ৩৬ ইয়ারস অব ওয়েট! এন্ড অব মেসি-রোনালদো ডিবেট।
সময়ের পালাবদলে, মেসি বার্সা ছেড়ে পাড়ি দিয়েছেন পিএসজি থেকে ইন্টার মায়ামিতে। অনেকেই বলেছেন, ইউরোপ ছেড়ে মেসি নিজেই তার ক্যারিয়ার ‘কবর’ দিয়েছেন। ভুল করেছেন। উচিত হয়নি। ব্লা-ব্লা-ব্লা !
অনেক ভক্তরা এটাও বলেছেন, আমেরিকানরা তো ফুটবলকে ফুটবল-ই বলে না, বলে সকার। সেখানে গেলেন মেসি!
এরমধ্যে আলোচনা ছিল ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ পাওয়ার পর অবসরে যাবেন মেসি। ৪ বছর ধরে, অবসর নিয়ে পরিষ্কারভাবে কিছুই বলেননি লিও।
সব জল্পনা-কল্পনা ভেঙ্গে ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখলেন মেসি। ফার্স্ট ম্যাচ। এখানে একটা বিষয় না বললেই নয়; মেসির ফেইলিওর দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলো চিরশত্রু কিংবা প্রতিবেশী ব্রাজিল। অন্যদিকে রিয়াল মাদ্রিদ সমর্থকরা তো আছেই। শত হলেও মাদ্রিদকে সবচেয়ে বেশি ও বারবার ‘দিলে’ আঘাত করেছেন মেসি।
তবে, সব আশায় পানি মেরে প্রথম ম্যাচেই নিজের হ্যাটট্রিক। সবচেয়ে বড় বিষয়, দলের জন্য ভাইটাল ‘জয়’ এনে দেওয়া। এরপর ক্রিটিক্স আসে, আলজেরিয়া ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ২৮ নম্বর। অপেক্ষাকৃত দুর্বল টিম। অলরাইট।
তাহলে গতকালের ম্যাচ? অস্ট্রিয়া ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ২১ নম্বর। আবারও দুর্বল টিম ‘ট্যাগ’। এরপর আবার ম্যাচের ৯ মিনিটের মধ্যে পেনাল্টি পেয়েও মিস করেন মেসি। সর্বোচ্চ গোলের পাশাপাশি পেনাল্টি মিসের রেকর্ড। মিডিয়া-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সব জায়গায়, এক কথায়, ডিটারজেন্ট ছাড়াই ধুয়ে দেওয়া হলো মেসিকে। সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করলে দেখা মিলে, ব্রাজিল সমর্থকরা আগুনে ফুঁ দিয়ে লিখছে, কই পেসি (কটাক্ষ করে মেসির নাম উল্টে দেয় সমর্থকরা)। খুব না গোট? হোয়্যার ইজ মেসি? ঠিক যেমনটা ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের সাথে আর্জেন্টিনা হারের পর হয়েছিলো। তখন সৌদি সমর্থক ছাড়াও ব্রাজিল ফ্যান কিংবা মাদ্রিদ ফ্যানরা বলছিলো, কই গোট? এরপর যা হয়েছে, তা গুগল করলেই হবে।
যারা মেসির বার্সেলোনা এ’রা থেকে খেলা দেখেন কিংবা সত্যিকার অর্থে ফুটবল ভালবাসেন, তাদের আর্জেন্টিনার সমর্থন করার প্রয়োজন নেই। কারণ, মেসি ইজ ওয়ান। আর কেউ এমন আসবেন কি না, বলা যায় না। যেমন: ব্রাজিলের ক্লাসিক রোনালদো নাজারিও একজন-ই। তার মতো স্পেশাল প্লেয়ার এখনও আসেনি। হয়তো মেসি বেটার কিংবা নট। কিন্তু ‘আর-৯’ ইজ সামথিং এলস। ঠিক যেমনটা রবার্টো কার্লোস-রিভালডো। অথবা ইতালির মালদিনি-ক্যানাভারো-পিরলো। অথবা জার্মানির ক্লোসা-ওজিল-ক্রুস- মাইকেল বালাক এ’রা। এরকম একজন ধরে ধরে বললে লিস্ট শেষ হবে না। কিন্তু মেসি এক-অদ্বিতীয়। কেউ মানুক কিংবা না মানুক। নাথিং চেঞ্জেস।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, মেসিকে আপনি যদি কটাক্ষ করেন কিংবা তাতিয়ে তোলেন, তাহলে মেসি আরও বিধ্বংসী ও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন। প্রমাণ? এল ক্লাসিকোর ওই ম্যাচে মেসিকে কনুই দিয়ে আঘাত করেছিলেন মারসেলো। অনেকই বলেন, মারসেলো ইচ্ছা করে আঘাত করেছিলেন। আবার অনেকে বলেন এক্সিডেন্ট। কিংবা মেসি ত্রেট শেষ করতে হলে মেসিকেই মাঠের বাইরে পাঠাতে হবে। সে যাই হোক। কিন্তু, ওই আঘাতের পর মেসি ‘কাম ব্যাক উইথ ফিউরি’।
এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, কেন এল ক্লাসিকোর সেই গোলের সাথে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে মেসির প্রথম গোলটি কমপেয়ার করা হলো? কারণ, কোন রকেট সাইন্স নেই। মেসির পজিশন, বল রিসিভ, গোল পোস্টের লেফট কর্নার: সব একই রকম। মেসির ডিকশনারিতে ম্যাচ প্লেন নেই। বহু বছর আগে এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, কোন ম্যাচের আগে প্রতিপক্ষ যতই কঠিন হোক না কেন, তার ম্যাচ প্ল্যান একই। টু প্লে। জাস্ট বেসিক। আর কোন ছক নেই। অস্ট্রিয়ার প্লেয়াররা নিশ্চয়ই সেই এল ক্লাসিকো সরাসরি কিংবা হাইলাইটস দেখেছেন। তারা জানেন, মেসির ট্রেডমার্ক কিংবা ইউএসপি কি। কীভাবে তিনি অ্যাটাক করেন। তারপরও কি আটকাতে পারলেন লিও’কে?
অস্ট্রিয়ার জায়গায় ফিফা ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিংয়ে যে দলই থাকতো, গোল অবধারিত।
সো, একসেপ্ট ইট। এঞ্জয় ইট। বিকজ এটাই মেসির দ্য লাস্ট ড্যান্স শো। ইউ নেভার সি হিম অ্যাগেইন।
আর লিও’র ক্ষেত্রে সত্য একটাই, ‘থিংগস ডোন্ট চেঞ্জ, মেসি ডোন্ট’।
মন্তব্য করুন