স্পোর্টস ডেস্ক 

দীর্ঘ ২৪ বছরের খরা কাটিয়ে অবশেষে ফুটবল বিশ্বকাপের মহামঞ্চে প্রত্যাবর্তন ঘটছে তুরস্কের। আর এই প্রত্যাবর্তন শুধুই একটি দলের ফেরা নয়, বরং রিয়াল মাদ্রিদের বিস্ময় বালক আরদা গ্যুলারের মতো এক ঝাঁক প্রতিভাবান তরুণ তুর্কির কাঁধে ভর করে বিশ্বজয়ের এক নতুন স্বপ্ন দেখা।
ফুটবলপ্রেমীদের মনে এখনো জ্বলজ্বল করছে ২০০২ সালের সেই সোনালী অতীত, যখন সেনোল গুনেসের অধীনে সেমিতে খেলে তৃতীয় হয়েছিল তুরস্ক। সেই রূপকথার স্মৃতি এবং বর্তমান তারুণ্যের জোয়ার—দুইয়ে মিলে তুর্কি সমর্থকদের আশা এখন আকাশচুম্বী। তবে মাঠের খেলায় ধারাবাহিকতার অভাব এবং বড় ম্যাচের চাপ সামলানোর মানসিকতা নিয়ে সংশয় কিন্তু এখনো কাটেনি।
প্রধান কোচ ভিনসেঞ্জো মন্তেল্লার অধীনে বেশ কিছু শ্বাসরুদ্ধকর ও কষ্টার্জিত জয়ের মাধ্যমে বাছাইপর্ব পার করেছে তুরস্ক। ইউরো ২০২৪-এর আশাব্যঞ্জক পারফরম্যান্সের পর দলটিকে নিয়ে যে নতুন উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, তার মূল পোস্টার বয় হলেন আরদা গ্যুলার।

তুর্কি সমর্থকদের বিশ্বাস, বর্তমান দলটি গত কয়েক দশকের মধ্যে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী স্কোয়াড হতে যাচ্ছে। দলে গ্যুলার ছাড়াও আছেন জুভেন্টাসের ক্ষিপ্রগতির ফরোয়ার্ড কেনান ইলদিজসহ ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোতে খেলা বেশ কয়েকজন তারকা।
তবে তুরস্কের এই স্বপ্নের বেলুন মাঝেমধ্যেই চেনা কিছু দুর্বলতার কারণে ফুসকে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। গত সেপ্টেম্বর মাসে কোনিয়ায় ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের কাছে ঘরের মাঠে ০-৬ গোলের লজ্জাজনক হার ছিল দলটির জন্য এক বিরাট ‘রিয়েলিটি চেক’।
এই বিধ্বস্ত পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছে যে, আক্রমণভাগে যতই প্রতিভা থাকুক না কেন, বিশ্বের এলিট দলগুলোর চেয়ে এখনো বেশ পিছিয়ে আছে তারা। এই হার তুরস্কের সেই পুরনো দুর্নামকেই আবার সত্যি প্রমাণ করেছে, তারা নিজেদের দিনে যেকোনো পরাশক্তিকে মাটিতে নামিয়ে আনতে পারে, আবার যেকোনো মুহূর্তে আবেগপ্রবণ হয়ে ডিফেন্সে খেই হারিয়ে তাসের ঘরের মতো ভেঙেও পড়তে পারে।
বিগত দুই দশক ধরে চলে আসা এই ধারাবাহিকতার অভাব দূর করতে কোচ মন্তেল্লা দলে কঠোর ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলা এবং মানসিক একাগ্রতা আনার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। ইউরো ২০২৪-এ তুরস্কের আগ্রাসী প্রেসিং এবং টেকনিক্যাল ফুটবল প্রশংসিত হলেও, অনেক ম্যাচেই তারা ব্যক্তিগত নৈপুণ্য এবং ভাগ্যের জোড়ে পার পেয়েছিল।

এবারের বিশ্বকাপে ডি-গ্রুপে খেলবে তুরস্ক, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র, প্যারাগুয়ে এবং অস্ট্রেলিয়া। টুর্নামেন্ট চলাকালীন অ্যারিজোনার মেসাতে থাকবে তাদের মূল বেস ক্যাম্প।
স্বাভাবিকভাবেই তুরস্কের ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করবে রিয়াল মাদ্রিদ তারকা আরদা গ্যুলারের পায়ের জাদুর ওপর। যার সৃষ্টিশীল ফুটবল ইতিমধ্যে তাকে দেশের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া তারকায় পরিণত করেছে এবং ভক্তরা আশা করছেন তাঁর হাত ধরেই তুরস্ক ফুটবলের এক নতুন যুগের সূচনা হবে।
মজার ব্যাপার হলো, গ্যুলারসহ এই স্কোয়াডের অনেক খেলোয়াড়ের জন্মই হয়নি ২০০২ সালে, যখন তুরস্ক তাদের ফুটবল ইতিহাসের সেরা সাফল্য পেয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক গৌরব আজ তুর্কি ফুটবলের লোকগাথা বা রূপকথায় পরিণত হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই নতুন প্রজন্ম নিজেদের নতুন কোনো ইতিহাস লিখতে পারে নাকি চিরচেনা সেই মানসিক অস্থিরতা আর ধারাবাহিকতাহীনতার বেড়াজালে আটকে পড়ে বিশ্বমঞ্চের স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়।
মন্তব্য করুন