আরসিটিভি ডেস্ক 

দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরূকরণের আভাস দিচ্ছে কওমি ঘরানার ইসলামী দলগুলোর ঐক্যপ্রক্রিয়া। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট ও বিএনপির রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে কওমি ধারার সাতটি দলকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম।
এক প্রতিবেদনে রূপালী বাংলাদেশ জানায়, সংগঠনটির আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর উদ্যোগে এরমধ্যে দলগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সমন্বয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। উদ্যোগটি সফল হলে ইসলামী দলগুলোর ভোট ও সাংগঠনিক শক্তির সমীকরণে পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক বলয়ের জন্যও এটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
আলোচনায় থাকা সাত দল হলো, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।
এরমধ্যে কয়েকটি দল সম্প্রতি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে ছিল বা রয়েছে। ফলে হেফাজতের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের বাইরে কওমি ঘরানার পৃথক একটি বলয় গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কওমি দলগুলোকে একত্র করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাবুনগর মাদরাসায় সাত দলের নেতাদের নিয়ে বৈঠক হয়েছে। হেফাজতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইমান-আকিদা সংরক্ষণ, দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থ এবং ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সমন্বয়ই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে এ উদ্যোগের ভিন্ন তাৎপর্যও খুঁজে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী প্রচার সম্পাদক মাওলানা ফয়সাল আহমদ বলেন, ‘কওমি ঘরানার সাতটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এখন আনুষ্ঠানিক জোটের সিদ্ধান্ত হয়নি। আপাতত নীতিগত ঐক্য ও সমন্বয় নিয়ে আলোচনা চলছে। পরবর্তী বৈঠকের পর কাঠামো ও রাজনৈতিক রূপরেখা স্পষ্ট হতে পারে।
সাত দলের প্রস্তাবনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে আদর্শিক সামঞ্জস্যের বিষয়টি। দলগুলোর বক্তব্যে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা ও আদর্শ অনুসরণের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মহিউদ্দীন বলেন, ‘জোট হলে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা ও আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। কোনো দলের নীতি, আদর্শ বা কর্মকাণ্ড আকিদা লঙ্ঘন করলে ওই দলের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার উপদেষ্টা পরিষদের থাকতে হবে।’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, ‘রাজনৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে কাছাকাছি দৃষ্টিভঙ্গি, হক্কানি উলামায়ে কেরামের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদার কারণে প্রাথমিকভাবে সাতটি ইসলামী রাজনৈতিক দল এ ঐক্যে শামিল থাকবে। তাঁর ভাষায়, এটি একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হিসেবে অভিহিত হবে।’
ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী বলেন, ‘ইসলামী দলগুলোর ঐক্য হলে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা প্রাধান্য পাবে। কেউ তা লঙ্ঘন করলে ওই ঐক্যে থাকতে পারবে না।’
এদিকে সাত দলের শীর্ষ নেতাদের সম্মানজনক অবস্থান এবং কর্মসূচি ও নীতি নির্ধারণে লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের প্রস্তাব এসেছে। প্রতিটি দল থেকে দুজন করে প্রতিনিধি নিয়ে এ কমিটি গঠনের কথা রয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সমন্বয় কমিটি বা মজলিসে শূরা গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দলটির নেতাদের আরেকটি প্রস্তাব হলো, শরিক দলগুলোর আমিররা পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন কর্মসূচি ও বৈঠকে নেতৃত্ব দেবেন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পক্ষ থেকেও নির্দিষ্টসংখ্যক সদস্য নিয়ে একটি বিশেষ ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের দীর্ঘদিনের আদর্শিক দূরত্বের কারণে এ উদ্যোগের রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। দেওবন্দি ধারার হেফাজত নেতারা বিভিন্ন সময় জামায়াতের মওদুদী চিন্তাধারা ও আকিদাগত অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। ফলে কওমি দলগুলোর পৃথক প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠলে ইসলামী রাজনৈতিক পরিসরে জামায়াতের প্রভাব কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চট্টগ্রাম সফরে ফটিকছড়ির আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদরাসায় হেফাজত আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং হেফাজতের পক্ষ থেকে নয় দফা দাবি তুলে ধরার ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ সরকারের সঙ্গে কওমি আলেম সমাজের এ যোগাযোগকে রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কের নতুন মাত্রা হিসেবে দেখছেন।
তবে জামায়াতে ইসলামী এ উদ্যোগকে বড় কোনো হুমকি হিসেবে দেখছে না। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল হালিম বলেন, ‘হেফাজত আমির ইসলামী সাত দলকে ধর্মীয় বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ করতে চাইছেন। এতে জামায়াতের রাজনীতিতে কোনো প্রভাব পড়বে না।’
মন্তব্য করুন