আরসিটিভি ডেস্ক 

বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া কাঁচা দুধ, প্যাকেটজাত তরল ও গুঁড়া দুধ এবং বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্যের প্রতিটি নমুনাতেই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের গবেষকদের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, দুধ গ্রহণের পরিমাণ ও শরীরের ওজনের কারণে প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের সম্ভাবনা বেশি।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের গবেষণা অনুদানের অর্থায়নে পরিচালিত এ গবেষণায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ৪১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ১৭টি কাঁচা দুধ, ১২টি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তরল ও গুঁড়া দুধ এবং ১২টি অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যের নমুনা ছিল। পরীক্ষায় প্রতিটি নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ মিলিলিটার প্যাকেটজাত দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক ০৬টি, কাঁচা দুধে ৯৩ দশমিক ৩৯টি এবং দুগ্ধজাত পণ্যে ৭০ দশমিক ৮০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। তাদের ধারণা, সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও প্যাকেটজাত করার বিভিন্ন ধাপে প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসার কারণেই প্যাকেটজাত দুধে কণার পরিমাণ বেশি হতে পারে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, প্লাস্টিকের প্যাকেট ও বোতলের পাশাপাশি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত পাইপ, ছাঁকনি, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, হাতমোজা, কর্মীদের পোশাক এবং কারখানার বাতাস থেকেও এসব ক্ষুদ্র কণা দুধে মিশতে পারে। তবে কোন উৎস থেকে কত পরিমাণ কণা এসেছে, তা এই গবেষণায় আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।
পরীক্ষায় পাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের অধিকাংশই ছিল স্বচ্ছ, আঁশের মতো এবং আকারে ২৫০ মাইক্রোমিটারের কম। কাঁচা দুধে প্রায় ৭৭ শতাংশ এবং প্যাকেটজাত দুধে প্রায় ৮৩ শতাংশ কণাই আঁশ আকৃতির ছিল। গবেষকদের মতে, কৃত্রিম তন্তুর পোশাক, প্লাস্টিকজাত উপকরণ ও উৎপাদন পরিবেশ থেকেই এ ধরনের কণার উৎস হতে পারে।
গবেষণায় বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক উপাদানও শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে টেফলন, পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট, নাইলন, পলিইথিলিন, পলিডাইমিথাইলসিলোক্সেন, পলিফেনিলিন সালফাইড, পলিভিনাইল ক্লোরাইড, পলিপ্রোপিলিন ও পলিস্টাইরিন উল্লেখযোগ্য।
গবেষকেরা বয়স, শরীরের ওজন এবং দুধ গ্রহণের পরিমাণ বিবেচনায় সম্ভাব্য মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের হার বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী প্যাকেটজাত দুধ পানকারী শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। শরীরের ওজন কম হলেও দুধের ওপর নির্ভরতা বেশি থাকায় শিশুদের দেহে তুলনামূলক বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
দূষণের মাত্রা ও প্লাস্টিকের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা কাঁচা দুধকে উচ্চ ঝুঁকি, প্যাকেটজাত দুধকে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যকে মাঝারি ঝুঁকির শ্রেণিতে রেখেছেন। যদিও কাঁচা দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংখ্যা তুলনামূলক কম, তবে সেখানে পাওয়া কিছু প্লাস্টিক উপাদানের বৈশিষ্ট্যের কারণে ঝুঁকির মাত্রা বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের দুগ্ধ সরবরাহ ব্যবস্থায় মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ খাদ্যনিরাপত্তার জন্য একটি নতুন উদ্বেগের বিষয়। এ ঝুঁকি কমাতে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন ধাপে প্লাস্টিকের ব্যবহার হ্রাস, উন্নত ছাঁকনি ব্যবস্থা চালু, কম প্লাস্টিক নির্গমনকারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদারের সুপারিশ করেছেন তারা।
মন্তব্য করুন