লালমনিরহাট প্রতিনিধি 

গত বছরের তুলনায় এবার পাটের ভালো দাম পাওয়ার আশায় লালমনিরহাটে পাটের আবাদ বাড়িয়েছিলেন কৃষকরা। তবে মৌসুমের শুরুতে টানা অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে সেই আশা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। বীজ বপন ও চারা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ সময়ে স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ায় অধিকাংশ জমিতে পাটগাছ স্বাভাবিক উচ্চতা পায়নি। ফলে আঁশের পরিমাণ কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিঘাপ্রতি ফলনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলেও লাভের মুখ দেখছেন না কৃষকরা।
কৃষকরা জানান, গত বছর পাটের ভালো দাম পাওয়ায় এবার তারা আবাদ বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু অতিবৃষ্টির কারণে অধিকাংশ এলাকায় পাটগাছ স্বাভাবিকের তুলনায় ২ থেকে ৫ ফুট কম উচ্চতার হয়েছে। এতে প্রতি বিঘায় গড়ে ৪০ থেকে ৬০ কেজি পর্যন্ত পাট কম উৎপাদন হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ফলন কমে যাওয়ায় অনেক কৃষকের পক্ষে বিনিয়োগের অর্থ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
আদিতমারী উপজেলার একাধিক কৃষক জানান, গত বছর পাঁচ বিঘা জমি থেকে ২৮ মণ পাট উৎপাদন হয়েছিল এবং প্রতিমণ ৩ হাজার ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করেছিলেন। ভালো দামের আশায় এবার এক বিঘা জমি বাড়িয়ে ছয় বিঘায় পাট চাষ করেন। কিন্তু এবার ছয় বিঘা জমি থেকে পেয়েছেন মাত্র ২৪ মণ পাট। প্রতি বিঘায় প্রায় ১৩ হাজার টাকা করে মোট উৎপাদন ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৮ হাজার টাকা। ফলে প্রত্যাশিত লাভ তো দূরের কথা, খরচ তুলতেই বেগ পেতে হচ্ছে।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানোর কাজ চলছে। আগামী এক মাসের মধ্যে বাজারে নতুন পাট পুরোপুরি উঠবে। ইতোমধ্যে সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন হাটে সীমিত পরিসরে নতুন পাটের কেনাবেচা শুরু হয়েছে। বর্তমানে প্রতি মণ নতুন পাট প্রায় ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় বেশি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও জমিতে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় পাটগাছের উচ্চতা মাত্র ৩ থেকে ৫ ফুট হয়েছে। আবার কিছু এলাকায় ৬ থেকে ৮ ফুট পর্যন্ত বেড়েছে। সাধারণত পাটগাছের উচ্চতা ৭ থেকে ১৩ ফুট হয়ে থাকে।
রংপুর আবহাওয়া অফিস ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে রংপুর অঞ্চলে ৫০৪ মিলিমিটার এবং মে মাসে ৭৮৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। গত বছর একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১৭০ ও ১৯৫ মিলিমিটার। অথচ পাট চাষের জন্য এপ্রিল ও মে মাসে ১৫০ থেকে ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতই যথেষ্ট।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে লালমনিরহাট জেলায় ৪ হাজার ৪৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৭৩০ হেক্টর বেশি। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৯ হাজার ৫৪৯ মেট্রিক টন। তবে বীজ বপন ও চারা বৃদ্ধির সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে পাটগাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিভাগটি।
কৃষকদের ভাষ্য, এক বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে পাট চাষে বর্তমানে প্রায় ১৬ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। অতিবৃষ্টির কারণে এক বিঘা জমিতে গড়ে মাত্র ৬ মণ পাট উৎপাদন হয়েছে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতি মণ ৪ হাজার টাকা হিসেবে বিক্রি করে ২৪ হাজার টাকা পাওয়া গেলেও উৎপাদন ব্যয় বাদ দিলে তিন মাসের পরিশ্রমে লাভ থাকে মাত্র ৮ হাজার টাকার মতো।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বাজারে নতুন পাটের দাম তুলনামূলক ভালো থাকলেও আবহাওয়াজনিত কারণে ফলন কমে যাওয়ায় কৃষকদের প্রত্যাশিত লাভ হচ্ছে না। ভবিষ্যতে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নত জাত ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কৃষি সহায়তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।
মন্তব্য করুন