লালমনিরহাট প্রতিনিধি 

প্রতিদিন ভোর হয়। সূর্যের আলো এসে পড়ে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার লতাবর গ্রামের একটি বাড়ির উঠানে। সেই আলো গিয়ে থামে বাঁশঝাড়ের নিচে খোলা একচালা ছাপড়ায়। সেখানে কাঠের একটি পুরোনো চৌকিতে বসে থাকেন ৮০ বছর বয়সী শফিকুল ইসলাম। তাঁর এক পায়ে ভারী লোহার শিকল। এই শিকলই তাঁর চার দশকের সঙ্গী। একটু অদুরে পাকা বাড়িতে স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের সংসার। অথচ শফিকুলের ঠিকানা বাড়ির বাইরে, উঠানের প্রায় ৫০ গজ দূরে একটি খোলা বারান্দা। ঝড়-বৃষ্টি, তীব্র রোদ, প্রায় ৮০ টি শীত বর্ষা কাটিয়েছেন শিকল পায়ে খোলা ঘরে।
কিন্তু শফিকুলের জীবন এমন ছিল না।
একসময় তিনি ছিলেন এলাকার পরিচিত পরিশ্রমী কৃষক। ভোরে লাঙল, কোদাল আর গরু নিয়ে মাঠে যেতেন। নিজের ঘামে জমি কিনেছেন, গড়ে তুলেছেন প্রায় ২৫ দোন কৃষিজমি ( স্থানীয় হিসেবে ২৭ শতকে এক দোন) সেই জমির ফসলেই বড় করেছেন দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে। পরিবারে ছিল স্বচ্ছলতা, ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন। হঠাৎ একদিন সবকিছু বদলে গেল,
পরিবারের দাবি, পারিবারিক নানা চাপের পর শফিকুলের আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। শুরু হয় কবিরাজি চিকিৎসা, পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল মেলেনি। একসময় চিকিৎসাও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় শিকলবন্দি জীবন।
আজ প্রায় ৪০ বছর ধরে একই বারান্দায় কাটছে তাঁর দিন। কাঠের চৌকিটাই তাঁর বিছানা। সেখানেই বসে থাকেন, ঘুমান। ক্ষুধা লাগলে চিৎকার করেন। বড় ছেলে মাহবুবুর রহমান খাবার এনে সামনে রাখলে নীরবে খেয়ে নেন। সপ্তাহে একদিন বাবা-ছেলের সেই নীরব সম্পর্কের আরেকটি দৃশ্য দেখা যায়, ছেলে গোসল করান, থাকার জায়গা পরিষ্কার করেন।
বারান্দার মেঝেটাই তার শৌচাগার। নেই মশারি, নেই ফ্যান, পাশের বাঁশ ঝাড়ের মশার উৎপাতে এক মিনিট টেকা দায়।
কেউ কাছে গেলে কখনো অপলক তাকিয়ে থাকেন, কখনো বিড়বিড় করে নিজের সঙ্গেই কথা বলেন। মাঝেমধ্যে পায়ের শিকলের দিকে তাকিয়ে তা খুলে দেওয়ার আকুতি জানান। কিন্তু সেই শিকল আর খোলে না।
স্ত্রী মালেকা বেগমের চোখে স্বামীর জন্য মায়া আছে, আবার ভয়ও কাজ করে তিনি জানালেন, অনেক চিকিৎসা করিয়েছি। ঘরে রাখলে ভাঙচুর করেন, আমাদের আঘাত করতে আসেন। তাই বাধ্য হয়েই বাইরে রাখতে হয়েছে। স্বামীর কষ্ট দেখে খুব খারাপ লাগে।
মেয়ে রেহানা বেগম, যিনি এখন ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য, তার ভাষ্য ছোটবেলা থেকেই বাবাকে এমন অবস্থায় দেখছি। ভালো চিকিৎসা করাতে পারিনি। টাকার অভাব ছিল, আবার জমিও বিক্রি করা সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শফিকুলের এক বাল্যবন্ধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, এই মানুষটাই একসময় সবার আগে মাঠে যেত। কত পরিশ্রম করেছে! এখন তাকে এভাবে শিকলে বাঁধা দেখে খুব কষ্ট হয়।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আমির হামজাও মনে করেন, একজন মানুষকে বছরের পর বছর শিকলবন্দি রাখা কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা।
শফিকুল ইসলামের গল্প কেবল একজন মানসিক রোগে আক্রান্ত বৃদ্ধের নয়। এটি একটি পরিবারের অসহায়ত্বের গল্প, গ্রামীণ বাস্তবতার গল্প, আর দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার গল্প।
উঠানের এক কোণে বসে থাকা শফিকুল হয়তো আজও অপেক্ষা করেন- কোনো একদিন হয়তো তাঁর পায়ের শিকল খুলবে। হয়তো তিনি আবার মাঠে ফিরবেন।
মন্তব্য করুন