কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি 

কাঁটাতারের দুই পাশে সশস্ত্র সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কড়া নজরদারি। মাঝখানে শূন্যরেখার একটি ছোট্ট ভূখণ্ড। সেখানে টানা ১৭ দিন ধরে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর মানবেতর জীবন কাটাচ্ছিলেন তিন যুবক। বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকতে পারেননি, আবার ভারতেও ফিরতে পারেননি। অবশেষে মঙ্গলবার (৩০ জুন) গভীর রাতের কোনো একসময় রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যান তারা। বুধবার (১ জুলাই) সকালে সীমান্ত এলাকায় গিয়ে তাদের আর কোনো খোঁজ মেলেনি।
ঘটনাটি ঘটেছে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার ভুন্দুরচর সীমান্তে। দীর্ঘদিন ধরে শূন্যরেখায় আটকে থাকা তিন যুবকের হঠাৎ অন্তর্ধানে সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ জুন রৌমারীর গয়টাপাড়া সীমান্তে ছয়জন এবং ভুন্দুরচর সীমান্তে তিনজনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বাধার মুখে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেননি। ফলে তারা দুই দেশের মধ্যবর্তী শূন্যরেখায় অবস্থান নিতে বাধ্য হন।
শুরু থেকেই তাদের অবস্থান ছিল অনিশ্চয়তায় ঘেরা। সীমান্তের মাঝখানে খোলা আকাশের নিচে দিন-রাত কাটাতে হয়েছে তাদের। স্থানীয়দের সহায়তায় কখনো খাবার, কখনো বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা হলেও নিরাপদ আশ্রয়ের কোনো সুযোগ ছিল না। বৃষ্টি, রোদ ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই দিন পার করছিলেন তারা।
এরই মধ্যে গয়টাপাড়া সীমান্তে অবস্থানরত ছয়জন একদিন হঠাৎ করেই সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে স্থান ত্যাগ করেন। এরপর ভুন্দুরচর সীমান্তে থাকা তিন যুবককে ঘিরে বাড়তে থাকে কৌতূহল। তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, শেষ পর্যন্ত কোন দেশে আশ্রয় মিলবে—এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল স্থানীয়দের মধ্যে।
রৌমারী উপজেলার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রুহুল আমিন জানান, বুধবার সকালে ভুন্দুরচর সীমান্ত এলাকায় গিয়ে তিনি দেখেন, দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করা তিন যুবকের কেউ সেখানে নেই। যে স্থানে তারা ছিলেন, সেটি সম্পূর্ণ ফাঁকা পড়ে আছে। একই সঙ্গে ওই এলাকায় বিএসএফ সদস্যদেরও দেখা যায়নি।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জামালপুর ৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান বলেন, ভোর থেকে শূন্যরেখায় তাদের আর দেখা যাচ্ছে না। রাতের কোনো একসময় তারা সেখান থেকে সরে পড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে তারা কোথায় গেছেন, কীভাবে শূন্যরেখা ত্যাগ করেছেন কিংবা বর্তমানে কোন দেশে অবস্থান করছেন—এসব বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের একটি অংশের ধারণা, রাতের অন্ধকারে বিজিবি ও বিএসএফের নজরদারির ফাঁক গলে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে থাকতে পারেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, তারা ভারতের দিকেও ফিরে যেতে পারেন।
দীর্ঘ ১৭ দিন ধরে সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে থাকা তিন যুবকের এ রহস্যময় অন্তর্ধান নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তারা কি নিজেরাই পালিয়ে গেছেন, নাকি অন্য কোনো উপায়ে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এ প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। তবে এক বিষয় নিশ্চিত, ১৭ দিনের মানবেতর জীবন শেষে রাতের আঁধারে তাদের হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা সীমান্তবাসীর আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
মন্তব্য করুন