আরসিটিভি ডেস্ক 

রংপুরের বদরগঞ্জে কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ভ্যানচালক আরিফুল ইসলাম হত্যা মামলার অন্যতম আসামি গোপাল ব্যানার্জিকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব ও পুলিশ। নওগাঁ জেলার সীমান্তবর্তী একটি এলাকা থেকে যৌথ অভিযানে তাকে আটক করা হয়। আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলেও বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গ্রেপ্তার হওয়া গোপাল ব্যানার্জি বদরগঞ্জ পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব ছিলেন। তিনি একাধিক হত্যা মামলার আসামি বলেও জানা গেছে। পুলিশ জানিয়েছে, এ মামলায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং বাকি আসামিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত ৫ মে বিকেলে বদরগঞ্জ উপজেলার বালুয়াভাটা আম্বিয়ার মোড় এলাকায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ভ্যানচালক আরিফুল ইসলামকে। নিহত আরিফুল ইসলাম (২৮) পৌরসভার পাঠানপাড়া গ্রামের রেজাউল ইসলামের ছেলে। তিনি জীবিকা নির্বাহের জন্য ভ্যান চালাতেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আরিফুল ছিলেন শান্ত স্বভাবের একজন সাধারণ মানুষ। ঘটনার সময় তিনি রেলঘুমটির রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রতিপক্ষের লোক ভেবে তাকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, গত বছরের ৫ এপ্রিল টিনের দোকানঘর নির্মাণ এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সংঘর্ষে লাভলু মিয়া নামে এক কর্মী নিহত হন। এ ঘটনায় বদরগঞ্জ থানায় পৃথক দুটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। এরপর থেকেই এলাকায় উত্তেজনা ও বিরোধ চলছিল।ঘটনার দিন রংপুর আদালতে একটি মামলায় হাজিরা দিতে যান কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য মমিনুলসহ পাঁচজন। একই সময়ে আদালতে উপস্থিত ছিলেন আরেক মামলার আসামি ফিরোজ শাহ শহ তার অনুসারীরা। আদালত প্রাঙ্গণে ফিরোজ শাহের অনুসারীদের সঙ্গে মমিনুল গ্রুপের সংঘর্ষ বাঁধে। এতে উভয়পক্ষের কয়েকজন আহত হন। পরে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হলেও আদালত থেকে বদরগঞ্জে ফেরার পর আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিশোধ নিতে মমিনুল ও তার অনুসারীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রতিপক্ষকে খুঁজতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা ফিরোজ শাহের বাড়িতে হামলার চেষ্টা চালায়। এরপর ফিরোজ শাহের পক্ষের লোকজনও প্রতিপক্ষের সন্ধানে বের হয়। বিকেল চারটার দিকে বালুয়াভাটা আম্বিয়ার মোড় এলাকায় প্রতিপক্ষের সদস্য ভেবে ভ্যানচালক আরিফুল ইসলামকে ছুরিকাঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কিশোর গ্যাং ও রাজনৈতিক আধিপত্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও অভিযোগ করেন তারা। এ ঘটনায় নিহত আরিফুল ইসলামের বাবা রেজাউল ইসলাম বাদী হয়ে বদরগঞ্জ থানায় ২১ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এছাড়া আরও পাঁচ থেকে ছয়জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে।
ঘটনার পর রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। গত সোমবার (১১ মে) বিকেলে রংপুর জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শরীফ নেওয়ার জোহা ও সাধারণ সম্পাদক আফতাবুজ্জামান সুজন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে গোপাল ব্যানার্জি ও বদরগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সম্রাটকে দল থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা পরিপন্থি কর্মকাণ্ড ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, গোপাল ব্যানার্জি তিনটি হত্যা মামলার এবং মুজাহিদুল ইসলাম সম্রাট চারটি হত্যা মামলার আসামি।নজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আফতাবুজ্জামান সুজন বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত কারও সঙ্গে ছাত্রদলের সম্পর্ক থাকতে পারে না। এদিকে নিহত আরিফুল ইসলামের পরিবার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলও এলাকায় কিশোর গ্যাং ও রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকার বলেন, র্যাব ও পুলিশ যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করে গোপাল ব্যানার্জিকে গ্রেফতার করেছি। তাকে রাতেই বদরগঞ্জ থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হবে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্য আসামিদেরও দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
মন্তব্য করুন