RCTV Logo নাটোর প্রতিনিধি
১০ অগাস্ট ২০২৬, ৩:০৮ অপরাহ্ন

নলডাঙ্গায় আমনের চারা রোপণে ব্যস্ত কৃষক, সবুজে ভরে উঠছে মাঠ

ছবিঃ আরসিটিভি

বর্ষার পানিতে সিক্ত মাঠ। কোথাও সদ্য চাষ করা জমি, কোথাও আবার সারিবদ্ধভাবে রোপণ করা হয়েছে সবুজ ধানের চারা। সকাল হলেই কাদা-পানিতে নেমে পড়ছেন কৃষক ও শ্রমিকরা। কারও হাতে ধানের চারা, কেউ ব্যস্ত জমি সমতল করতে, আবার কেউ সারিবদ্ধভাবে চারা রোপণ করছেন। এমন কর্মচঞ্চল দৃশ্য এখন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন মাঠে। চারদিকে চলছে রোপা আমন ধানের চারা রোপণের ব্যস্ততা।

চলতি মৌসুমে নলডাঙ্গা উপজেলায় ৩ হাজার ৬৯৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে উপজেলা কৃষি বিভাগ। এরই মধ্যে ২ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি জমিতেও দ্রুতগতিতে চলছে রোপণ কার্যক্রম। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।

উপজেলার বাঁশিল দক্ষিণপাড়া, সেনবাগ, বাসুদেবসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আমন চাষকে ঘিরে কৃষকদের মধ্যে বেড়েছে কর্মচাঞ্চল্য। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জমিতে চারা রোপণ করছেন। কোথাও আবার দলবদ্ধভাবে শ্রমিকরা সারি ধরে চারা লাগাচ্ছেন। জমির আইলজুড়ে দেখা যাচ্ছে সবুজ আমনের চারা।

সবুজ চারায় বদলে যাচ্ছে মাঠের চিত্র

বাঁশিল দক্ষিণপাড়া গ্রামের কৃষক মোঃ আরিফুল ইসলাম বলেন, আমন ধান এলাকার কৃষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফসল। বর্ষার পানি পাওয়ায় এবার জমি প্রস্তুত করা ও চারা রোপণে সুবিধা হচ্ছে। সময়মতো চারা রোপণ করতে পারলে এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো ফলনের আশা করছেন তিনি।

তিনি বলেন, “ধানের ফলন ভালো হলে কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে। সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি নতুন মৌসুমের জন্য প্রস্তুতি নেওয়াও সহজ হবে। তবে উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়াটাও জরুরি।”

খরচ বাড়লেও ভালো ফলনের প্রত্যাশা

সেনবাগ এলাকার কৃষক মোঃ আতাউর রহমান বলেন, আমনের চারা রোপণের জন্য এখন উপযুক্ত সময়। জমিতে পানি ও প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা থাকায় চারা রোপণে সুবিধা হচ্ছে। তবে শ্রমিকের মজুরি, সার, বীজ ও জমি প্রস্তুতের খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।

তিনি বলেন, “খরচ যতই হোক, কৃষক চাষাবাদ করবেই। ধান আমাদের প্রধান ফসল। এবার রোগবালাই কম থাকলে এবং আবহাওয়া ভালো থাকলে ফলন ভালো হবে বলে আশা করছি।”

বাসুদেব এলাকার কৃষক আব্দুল হাকিম বলেন, আমনের চারা রোপণের কাজ এখন পুরোদমে চলছে। জমি প্রস্তুত করে সময়মতো চারা লাগানো হচ্ছে। কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী উন্নত জাতের ধান চাষ করছেন তারা। ভালো ফলনের পাশাপাশি ধানের ন্যায্যমূল্য পেলে কৃষকরা বেশি লাভবান হবেন।

উন্নত জাতের ধানে কৃষকের আগ্রহ

নলডাঙ্গা উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে কৃষকদের উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাতের ধান চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা ব্রি ধান-৭৫, ব্রি ধান-৮৭, ব্রি ধান-৯০, ব্রি ধান-৯১, ব্রি ধান-৯৩, ব্রি ধান-৯৪, ব্রি ধান-১০৩, বিনা ধান-২০, বিনা ধান-২২ ও বিনা ধান-২৬ জাতের ধান চাষ করছেন।

উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রঞ্জিত রঞ্জিত সিংহ,  মোঃ আশরাফুল দৌলা খোকন, মোঃ মামুনুর রশিদ ও মোঃ সাইদুর রহমান জানান, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। চারা রোপণের সময় উপযুক্ত বয়সের চারা নির্বাচন, নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা এবং সুষম সার ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে।

নলডাঙ্গা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার মোঃ সাজ্জাদ হোসাইন ও কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার মোঃ নাহিদুল ইসলাম নাহিদ বলেন, নলডাঙ্গায় রোপা আমন চাষের কার্যক্রম ভালোভাবেই এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে ২ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে চারা রোপণ হয়েছে। কৃষকরা যাতে সময়মতো চারা রোপণ করতে পারেন, সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আশাবাদী কৃষি বিভাগ

নলডাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ সবুজ আলী বলেন, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৩ হাজার ৬৯৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। রোপণ কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে।

তিনি বলেন, “নলডাঙ্গার কৃষকরা আমন চাষে অত্যন্ত আগ্রহী। আবহাওয়া ও মাঠের বর্তমান পরিস্থিতি কৃষির জন্য মোটামুটি অনুকূলে রয়েছে। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, চলতি মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে।”

তিনি আরও বলেন, ভালো ফলনের জন্য চারা রোপণের পর থেকেই জমির নিয়মিত পরিচর্যা করতে হবে। সুষম সার প্রয়োগ, আগাছা দমন, প্রয়োজনীয় পানি ব্যবস্থাপনা এবং রোগবালাইয়ের বিষয়ে কৃষকদের সতর্ক থাকতে হবে। কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

কৃষকের চোখে নতুন স্বপ্ন

আমন ধানকে ঘিরে শুধু মাঠেই নয়, নলডাঙ্গার গ্রামীণ অর্থনীতিতেও তৈরি হয়েছে নতুন কর্মচাঞ্চল্য। চারা রোপণ থেকে শুরু করে আগাছা পরিষ্কার, সার প্রয়োগ, ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানো—প্রতিটি ধাপেই কাজের সুযোগ তৈরি হয় কৃষি শ্রমিকদের।

কৃষকের কাছে একটি ভালো আমন মৌসুম মানে শুধু গোলাভরা ধান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের খরচ মেটানো, সন্তানের পড়াশোনা, ঋণ পরিশোধ এবং পরবর্তী ফসলের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার স্বপ্ন।

তাই কাদা-পানিতে দাঁড়িয়ে ধানের চারা রোপণ করতে করতে কৃষকের চোখে এখন একটাই স্বপ্ন—আজকের এই সবুজ চারা একদিন সোনালি ধানে ভরে উঠবে মাঠ। সেই ধানের ফলনে ঘরে ফিরবে স্বস্তি, আর কৃষকের মুখে ফুটবে হাসি।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কাহারোলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, ৭ জনকে ২ হাজার ৩০০ টাকা জরিমানা

কুড়িগ্রামের চার বিদ্যালয়ের এসএসসি পরিক্ষার্থী সবাই ফেল করেছে

মাথা ব্যথার কারণ হেডকে নিয়ে যে পরিকল্পনা তাসকিনের

ছেলের জন্মদিনে ঘরোয়া আয়োজন, পরীমনির আবেগঘন বার্তা

অলি আহমদের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করল ১১ দলীয় ঐক্য

গোবিন্দগঞ্জে পরিত্যক্ত ফ্লাওয়ার মিল এলাকা থেকে যুবকের মরদেহ উদ্ধার

লালমনিরহাটে ন্যায্যমূল্যে সার না পাওয়ার অভিযোগে মহাসড়ক অবরোধ, দীর্ঘ যানজট

নলডাঙ্গায় আমনের চারা রোপণে ব্যস্ত কৃষক, সবুজে ভরে উঠছে মাঠ

ছেলের পর মারা গেলেন মা, হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন বাবা

‘ছাদ থেকে পড়ে’ ছাত্রদল নেতার মৃত্যুর ঘটনায় ৪ পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার

১০

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেউ পাস করতে পারেনি

১১

এ বছর এসএসসিতে সব থেকে বেশি ফেল করেছে ইংরেজি ও গণিতে

১২

অলসদের দিন আজ

১৩

প্রস্তুতি ম্যাচ দিয়ে বাংলাদেশকে বিচার করতে নারাজ হেড

১৪

লালমনিরহাটে র‍্যাবের উদ্যোগে মাদকবিরোধী টাউন হল মিটিং

১৫

এসএসসি-সমমান পরীক্ষায় ফেল করেছে ৬ লাখ ৯০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী

১৬

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী

১৭

পাসের হার জিপিএ-৫ দুটিতেই এগিয়ে মেয়েরা

১৮

যোগ্য ও ত্যাগীরাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সুযোগ পাবেন: তারেক রহমান

১৯

এসএসসি-সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ, পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ

২০