আন্তর্জাতিক ডেস্ক 

ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জিপিএস সংকেত বিঘ্নিত করার পেছনে রাশিয়ার স্যাটেলাইট ব্যবহৃত হচ্ছে বলে দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, মহাকাশভিত্তিক এই হস্তক্ষেপ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সম্প্রতি টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, কয়েক বছর ধরে চলা রহস্যজনক জিপিএস বিঘ্নের উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে তারা রাশিয়ার একটি স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ককে চিহ্নিত করেছেন। গবেষকদের মতে, এই স্যাটেলাইটগুলো বিশেষ ধরনের কক্ষপথে অবস্থান করে জিপিএস সংকেতের ওপর প্রভাব ফেলছে।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৯ সাল থেকে এ ধরনের হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর গবেষকরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে রাশিয়ার প্রাথমিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত কয়েকটি স্যাটেলাইট এ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জিপিএস বা বৈশ্বিক অবস্থান নির্ণয় ব্যবস্থা শুধু স্মার্টফোনের নেভিগেশনের জন্য নয়; বিমান চলাচল, জাহাজ পরিচালনা, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ এবং আর্থিক লেনদেনসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এ ধরনের হস্তক্ষেপ নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে জিপিএস জ্যামিং ও স্পুফিংয়ের অভিযোগ নতুন নয়। ইউরোপীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়া ইলেকট্রনিক যুদ্ধের অংশ হিসেবে স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ বাড়িয়েছে।
লিথুয়ানিয়ার যোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তারা সম্প্রতি দাবি করেন, রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ অঞ্চল থেকে পরিচালিত জিপিএস স্পুফিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, ওই অঞ্চলে স্পুফিং অ্যান্টেনার সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে এবং এর প্রভাব বাল্টিক অঞ্চল ছাড়িয়ে ইউরোপের আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
ফিনল্যান্ডের কোস্টগার্ডও জানিয়েছে, বাল্টিক সাগর এলাকায় জাহাজ চলাচলের সময় জিপিএস সংকেত বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা বেড়েছে। এর ফলে কিছু জাহাজ পথ হারিয়েছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
গত বছর ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েনকে বহনকারী একটি বিমানের জিপিএস ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হয়েছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তারা এ ঘটনার পেছনে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।
তবে রাশিয়া এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মস্কোর দাবি, ইউরোপীয় দেশগুলো যে অভিযোগ তুলছে, তার পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বাস্তব তথ্য ছাড়া এ ধরনের অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, স্যাটেলাইটভিত্তিক নেভিগেশন ব্যবস্থা এখন কেবল বেসামরিক প্রযুক্তির অংশ নয়; এটি ক্রমশ ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আধুনিক যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। গবেষকদের সতর্কবার্তা সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
মন্তব্য করুন