আরসিটিভি ডেস্ক 

দেশের বিমান চলাচল ব্যবস্থায় নতুন মাইলফলক হিসেবে যুক্ত হয়েছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নতুন এটিসি টাওয়ার। এর কার্যক্রমে আকাশসীমা আরও সুরক্ষিত হয়েছে এবং ফ্লাইং ওভার চার্জ আদায়ের কার্যক্রমও হয়েছে অধিকতর গতিশীল।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অত্যাধুনিক রাডার সিস্টেম ও নতুন এটিসি টাওয়ারের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর তা পরীক্ষামূলক ও নিয়মিত কার্যক্রমে যুক্ত হয়। এরপর গত ২০ এপ্রিল বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম। আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করেন।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, দেশের আকাশসীমা ব্যবহারকারী উড়োজাহাজ থেকে আদায় হওয়া ফ্লাইং ওভার চার্জে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত এ খাতে আয় হয়েছিল ১৫৭ কোটি ১৫ লাখ ৫৮ হাজার ৬৬০ টাকা। পরের বছর একই সময়ে আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৮৪ কোটি ৫৩ লাখ ১২ হাজার ৭৬১ টাকায়। আর ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে এ খাতের আয় আরও বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৯ কোটি ২৮ লাখ ৭৩ হাজার ৮১০ টাকায় পৌঁছেছে।
রাডার ও এটিসি ব্যবস্থার আধুনিকায়নের সুফল হিসেবে ওভার ফ্লাইং চার্জ আদায়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে এ খাতে আয় হয়েছিল ৫৩ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৫৮০ টাকা। পরের বছর একই মাসে আয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭ কোটি ৯৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭৭৮ টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় ১৪ কোটি ৩৪ লাখ ৪৭ হাজার ১৯৮ টাকা বেশি। আর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ওভার ফ্লাইং চার্জ থেকে আদায় হয় ৮০ কোটি ১৬ লাখ ৫৬ হাজার ২৬৬ টাকা। ফলে ২০২৪ সালের জানুয়ারির তুলনায় চলতি বছরের প্রথম মাসে অতিরিক্ত আয় হয়েছে ২৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪৮ হাজার ৬৮৬ টাকা।
ফেব্রুয়ারি মাসেও ফ্লাইং ওভার চার্জ আদায়ে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ৪৭ কোটি ৪৩ লাখ ৯৭ হাজার ৮০ টাকা। পরের বছর একই মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ কোটি ২৯ লাখ ৭৯ হাজার ১১৩ টাকায়। আর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদায় আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৬৯ কোটি ৫৮ লাখ ২৬ হাজার ২২৬ টাকায় পৌঁছায়। ফলে দুই বছরের ব্যবধানে ফেব্রুয়ারি মাসের আয় প্রায় ২২ কোটি টাকা বেড়েছে।
২০২৪ সালের মার্চে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ৫৬ কোটি ১২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। পরবর্তী বছর ২০২৫ সালের মার্চে আদায় বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ কোটি ২৯ লাখ ৭৮ হাজার ৮৭০ টাকায়। আর ২০২৬ সালের মার্চে আয় আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৬২ কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার ১০৮ টাকায় পৌঁছায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ২০২৫ সালে নতুন এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) টাওয়ার চালুর পর থেকেই ফ্লাইং ওভার চার্জ বাবদ রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারকারী উড়োজাহাজগুলোর ওপর নজরদারি সক্ষমতা বাড়ায় আগে শনাক্তের বাইরে থাকা অনেক ফ্লাইটও এখন পর্যবেক্ষণের আওতায় এসেছে। ফলে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণও বেড়েছে।
এর আগে ব্যবহৃত রাডার ও নেভিগেশন ব্যবস্থা ছিল তুলনামূলকভাবে পুরোনো এবং সীমিত সক্ষমতার। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন আকাশসীমার একটি বড় অংশ কার্যকর নজরদারির বাইরে থাকত। এতে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করেও কিছু উড়োজাহাজের কাছ থেকে নির্ধারিত ফি আদায় করা সম্ভব হতো না। আন্তর্জাতিক বিধান অনুযায়ী, কোনও বিদেশি উড়োজাহাজ বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করলে ‘ফ্লাইং ওভার চার্জ’ পরিশোধ করতে হয়। আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার ফলে এখন সেই ফি আদায় আরও কার্যকর হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থার আওতায় স্থাপিত এস-ব্যান্ড প্রাইমারি রাডার ৮০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম। পাশাপাশি মোড-এস সেকেন্ডারি সার্ভেল্যান্স রাডার ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত কভারেজ প্রদান করবে, যা দেশের আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ ও বিমান চলাচল ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বেবিচকের কর্মকর্তারা বলছেন, এই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের জন্য রিয়েল-টাইম তথ্যপ্রাপ্তি, উন্নত মনিটরিং, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট আরও সহজ ও কার্যকর হয়েছে। এর ফলে বিমান চলাচলের নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, ফ্লাইট পরিচালনা আরও সুশৃঙ্খল হবে এবং আকাশসীমার ব্যবহার আরও দক্ষতার সঙ্গে করা সম্ভব হচ্ছে।
২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ফ্রান্স দূতাবাসের মাধ্যমে থ্যালেস কোম্পানি বাংলাদেশে আধুনিক রাডার, এটিএম-সিএনএস সিস্টেম, এটিসি টাওয়ার ও এটিএম পরিচালনা কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করতে ২০১৯ সালের ৮ মে অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিইএ) জি-টু-জি ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের অনুমোদন দেয়। পরবর্তী সময়ে কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন, আইসিএও’র মতামত গ্রহণ এবং বাংলাদেশ-ফ্রান্সের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রকল্পের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়। পরে সরকারি অর্থায়নের পরিবর্তে সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ২০২১ সালের ৩১ মার্চ সিসিইএ এ বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন হয়।
জি-টু-জি ভিত্তিতে বাস্তবায়িত এটিএম-সিএনএস সিস্টেম প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৭৩০ কোটি টাকা, যা সম্পূর্ণভাবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিএএবি) অর্থায়ন করে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এর মোট ব্যয় শেষ পর্যন্ত ৯৪২ কোটিতে পৌঁছায়।
বেবিচকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ কর্মকর্তা) কাওছার মাহমুদ জানান, ‘আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই টাওয়ার দেশের বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এর মাধ্যমে ফ্লাইট পরিচালনা আরও নিরাপদ হয়েছে এবং দেশের সমগ্র আকাশসীমা এখন সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের আওতায় এসেছে। ফলে আকাশপথে চলাচলকারী কোনো বিমান আর নজরদারি এড়াতে পারবে না।’
নতুন এটিসি টাওয়ারের সুফল ইতোমধ্যে দৃশ্যমান বলে জানিয়েছেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ। তিনি বলেন, টাওয়ারটি চালুর পর ফ্লাইং ওভার চার্জ আদায়ের হার বেড়েছে। একই সঙ্গে দেশের আকাশসীমার পূর্ণাঙ্গ নজরদারি নিশ্চিত হওয়ায় রাডার এড়িয়ে কোনো ফ্লাইটের প্রবেশের সুযোগ নেই। তিনি এ অর্জনকে বাংলাদেশের বিমান চলাচল ব্যবস্থার জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন।
মন্তব্য করুন