নীলফামারী প্রতিনিধি 

সেদিন ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বেলা ১২ টার দিকে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী নীলফামারী শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে চলছিল বিক্ষোভ। এসময়ে জেলা শহরের সাংবাদিকদের সঙ্গে সেখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে যায় রায়হান আলী। তবে সবার মতো স্বাভাবিক সুস্থভাবে আর ফেরা হয়নি তার।
রায়হান আলী নীলফামারী সদরের পঞ্চপুকুর ইউনিয়নের উত্তরা শশী পুরানা কাছারি পাড়া গ্রামের আলী হোসেনের ছেলে। তিনি অনলাইন নিউজ পোর্টাল স্বদেশ বার্তা টুয়েন্টিফোর ডট কমে কর্মরত ছিলেন।
জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের ডাকা কর্মসূচিতে বিভিন্ন জায়গা থেকে ছাত্র জনতা শহরে আসতে শুরু করেন। অনেকে এসে চৌরঙ্গী মোড়ে একত্রিত হয়। এদিকে তাদের প্রতিহত করার চেষ্টা করে একপর্যায়ে ছাত্র জনতার ওপর টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে যায় পুলিশ। সেখানেই দাঁড়িয়ে সংবাদ সংগ্রহ করছিলেন রায়হান আলী, তার হাতে ক্যামেরা দেখে পুলিশ বেপরোয়া হয়ে অতর্কিত হামলা করেন। এসময়ে টিয়ারশেল আর পুলিশের লাঠিচার্জে গুরুতর আহত হয় রায়হান আলী। কিছুক্ষণ পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সে আহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে তার খোঁজ খবর নিতে হাসপাতালে ছুটে যান সহকর্মীরা। তবে রায়হানের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। সেখানে তার শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে না আসায় কিছুদিন পর ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সেখানে দীর্ঘদিন নিজের পরিবারের অর্থায়নে চিকিৎসা নেওয়ার পরেও সুস্থ না হওয়ায় সরকারের সহায়তায় তাকে ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর থাইল্যান্ডের ব্যাংককস্থ ভেজথানি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
আরও জানা যায়, থাইল্যান্ড হাসপাতালে যাওয়ার পরে তার শরীরে ১৮টিরও বেশি অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। সুস্থ হওয়ার পথ এখনো দীর্ঘ, সামনে রয়েছে আরো কয়েক দফা অস্ত্রোপচার। দীর্ঘ সময় পার হলেও শরীর পুরোপুরি সাড়া দিচ্ছে না, প্রতিটি দিন কাটছে অনিশ্চয়তা ও নির্ঘুম যন্ত্রণায়। অপরদিকে কৃষক বাবার দারিদ্রতা আর রায়হানের জীবনের অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন কাটছে পরিবারের ।
সাংবাদিক রায়হান আলী বলেন, আমি সেদিন সংবাদ সংগ্রহ করতে যাই, এসময়ে পুলিশের লাঠিচার্জ আর গুলির দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণা করছিলাম। এসময়ে হঠাৎ করে পিছন দিক থেকে পুলিশ আমার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।পরে আমাকে বেধরক মারধর করলে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি, এসময়ে আশপাশের লোকজন আমাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে আমাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, আমার শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা নেই। আমাকে পরিবারের ভিটেমাটি রেখে সবকিছু বিক্রি করে প্রায় দশ লাখ টাকা খরচ করে দেশে চিকিৎসা করা হয়। আমার বাবার উর্পাজনের একমাত্র একটি মুদি দোকান ছিল সেটাও বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এখন আমি ছাড়া উর্পাজন করে আমার পরিবার চালানোর মতো কোন ব্যক্তি নাই। আমার বৃদ্ধ মা বাবা খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছে। আমার পরিবারের সবকিছু বিক্রি করে রংপুর ও ঢাকায় আমার চিকিৎসা করা হয়। পরে দেশে সুস্থ না হওয়ার পর সরকারের সহায়তায় থাইল্যান্ডে পাঠিয়ে এখানে অস্ত্রোপাচার করা হয়েছে আরও বাকি আছে। আমি এখানে এসে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছি। আমি ছিলাম আমার বাবার একমাত্র ভরসা, আজকে আমি মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছি। আমার এক ছোট ছেলে বাচ্চা আছে চার বছর বয়স সেও অবুঝ। আমি সুস্থ হতে চাই, এছাড়াও সরকার যদি আমার পরিবারকে সহায়তা করে তারা ভালোভাবে খেয়ে পড়ে বাঁচতে পারবে, আমার ভিটেমাটি ছাড়া কিছু নাই। আমার বৃদ্ধ বাবা ঠিকমতো কাজ করতে পারেনা তারা অভাবে ঠিকমতো খেতে পারছেনা।
রায়হানের পিতা আলী হোসেন বলেন, আমার ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে আমার সবকিছু বিক্রি করে দিয়েছি। এখন শুধুমাত্র আমার বাড়িভিটে ছাড়া আর কিছু নাই। মানুষের কথা বলতে গিয়ে আজ আমাদের ছেলে নিজের জীবনটাই হারানোর পথে। চিকিৎসার পেছনে যা কিছু ছিল সব শেষ হয়ে গেছে। আমি বৃদ্ধ মানুষ কোন কাজ করতে পারিনা এখন যে তিনবেলা ঠিকমতো খাব সেটার উপায় নাই। এখন দেশবাসীর মানবিক সহযোগিতা এবং সরকারের সহায়তা ছাড়া আমাদের আর কোনো ভরসা নেই।
দীপ্ত টেলিভিশনের নীলফামারী প্রতিনিধি মামুনুর রশীদ মিঠু বলেন, আমরা সেদিন একসঙ্গে সংবাদ সংগ্রহ করছিলাম। পুলিশের গুলি টিয়ারশেল নিক্ষেপ সবাই চেষ্টা করছিলাম নিরাপদ জায়গায় থেকে ছবি ও ভিডিও ধারনের। তবে রায়হান বিক্ষোভের মাঝ থেকে ভিডিও ধারন করছিলেন। সে এখন চিকিৎসাধীন আছেন সরকারের কাছে অনুরোধ তার পরিবারে খোঁজ খবর নিয়ে সহায়তা করা।
এবিষয়ে ঢাকা পোস্টের নীলফামারী প্রতিনিধি শাহজাহান ইসলাম লেলিন বলেন, সেদিন ডিসির মোড় ও চৌরঙ্গী মোড় এলাকায় সব দিক থেকে আন্দোলনকারীরা আসতেছিল। এসময়ে পুলিশ টিয়ারসেল নিক্ষেপ ও গুলি করছিলেন৷ এসময়ে আমরা সংবাদকর্মীরা নিরাপত্তা স্থানে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। তবে রায়হান আমাদের সঙ্গেই ছিল চৌরঙ্গী মোড়ে পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করছিল সে আমাদের কাছ থেকে চলে গিয়ে ভিডিও ধারন করছিল। এসময়ে পুলিশ তার ওপর অর্তকিত হামলা চালায়, এসময়ে টিয়ারসেলের ধোয়া আর লাঠির আঘাতে সে গুরুত্বর আহত হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আমরা সরকারের কাছে আশা করি তাকে সহায়তা করবেন৷
পঞ্চপুকুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ ওয়াহেদুজ্জামান বলেন, এক দিকে ছেলের বিদেশের মাটিতে যন্ত্রণাদায়ক দিন কাটছে অপর দিকে দেশে তার বৃদ্ধ বাবা-মা ও চার বছর বয়সী শিশুপুত্রের দিন কাটছে চরম উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায়। বাবার অপেক্ষায় থাকা শিশু লাবিবের চোখের পানি আর সন্তানের সুস্থতার জন্য বাবা-মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে আশপাশের পরিবেশ। সরকারের তার পরিবারের খোঁজ খবর নিয়ে সহায়তা করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে নীলফামারী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুবাশ্বিরা আমাতুল্লাহ বলেন, তার পরিবারের খোঁজ খবর নিয়ে সহায়তা করার চেষ্টা করা হবে।
মন্তব্য করুন