কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি 

কুড়িগ্রামের নদীগুলো যেন এ বছর আরও ক্ষুধার্ত। তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার আর ব্রহ্মপুত্র। চারদিক থেকে ধেয়ে আসা পানির তোড়ে প্রতিদিন একটু একটু করে গিলে খাচ্ছে মানুষের স্বপ্ন, স্মৃতি আর শেষ আশ্রয়টুকু। ভাঙনের এই নির্মম খেলায় ফসলি জমি আর বসতভিটা হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে নদীতীরবর্তী হাজারো পরিবার। অনিশ্চয়তার অন্ধকারে তাদের প্রতিটি দিন যেন একেকটি দীর্ঘশ্বাস।
পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর রূপ বদলে যাচ্ছে। শান্ত স্রোত হঠাৎই হয়ে উঠছে ভয়াল। গতকাল যে জমিতে সোনালি ধান দুলছিল, আজ তা তলিয়ে গেছে নদীর গর্ভে। কৃষকের চোখে এখন ফসলের স্বপ্ন নয়, শুধু হাহাকার। ভুট্টা, ধানসহ বিভিন্ন ফসলি জমি বিলীন হয়ে যাওয়ায় জীবিকার পথও সংকুচিত হয়ে এসেছে। অনেকের বসতবাড়িও এখন নদীর কিনারায় টিকে থাকার শেষ লড়াই লড়ছে।
নদীগুলোর পথচলাও যেন এই গল্পের অংশ। ভারতের সিকিম থেকে নেমে আসা তিস্তা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কুড়িগ্রামের বুক চিরে এগিয়েছে ব্রহ্মপুত্রের দিকে। একইভাবে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা আর দুধকুমার সব নদীই বহমান, কিন্তু তাদের এই প্রবাহ যেন এখন মানুষের জীবনে বয়ে আনছে দুঃসহ বাস্তবতা। কুড়িগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এসব নদীর দীর্ঘ পথজুড়ে ছড়িয়ে আছে ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, তিস্তার প্রায় ৪৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙনের ঝুঁকি রয়েছে। রাজারহাট, উলিপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে বেশ কিছু অংশ চিহ্নিত করা হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে। কিন্তু এসব পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে অসংখ্য মানুষের অজানা কষ্টের গল্প।
উলিপুরের হাতিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আছিয়া বেগমের কণ্ঠে সেই আতঙ্ক স্পষ্ট “এই ভিটাটুকুই আমাদের সব। নদী যদি এটা নিয়ে যায়, আমরা কোথায় যাব?” তার কথার মধ্যেই ফুটে ওঠে এক জীবনের সঞ্চিত স্বপ্ন হারানোর ভয়।
শুধু ঘরবাড়ি নয়, ঝুঁকিতে রয়েছে শিক্ষার আলোও। ভাঙনের মুখে থাকা একটি বেসরকারি স্কুলের কথা বলতে গিয়ে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিমা আক্তারের প্রশ্ন “আমাদের স্কুলটা যদি নদীতে চলে যায়, আমরা কোথায় পড়ব?” এই প্রশ্ন যেন পুরো এলাকার শিশুদের ভবিষ্যৎকে নাড়া দেয়।
তিস্তা পাড়ের বাসিন্দা কামরুজ্জামান বলেন, প্রতিবছরই ভাঙনে অসংখ্য পরিবার নিঃস্ব হয়। তার কণ্ঠে দাবি, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে হয়তো এই দুর্ভোগ কিছুটা কমবে। অন্যদিকে যাত্রাপুরের লেবু মিয়ার আশঙ্কা, দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে হাট-বাজার, নিরাপত্তা স্থাপনা আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও হুমকির মুখে পড়বে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হলেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না। মাঝে মাঝে বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়, কিন্তু তা যেন উত্তাল নদীর সামনে সামান্য প্রতিরোধ মাত্র। বর্ষা এলেই নদীপাড়ে শুরু হয় কান্না, আর মানুষের জীবন হয়ে ওঠে অনিশ্চয়তার প্রতিচ্ছবি।
কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু মনে করেন, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন জরুরি। তাতে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিতে বাধ্য হবে।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ শুরু করা হবে এবং পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।
তবুও প্রশ্ন থেকে যায়। নদীর এই অদম্য ক্ষুধার সামনে মানুষের এই লড়াই কতদিন? প্রতিটি ভাঙন শুধু মাটি নয়, ভেঙে দেয় মানুষের স্বপ্ন, শেকড় আর ভবিষ্যৎ। কুড়িগ্রামের নদীপাড়ে তাই আজ শুধু ভাঙন নয়, বয়ে চলছে এক নীরব আর্তনাদ।
মন্তব্য করুন