রাজশাহী ব্যুরো 

শীত মৌসুম আসলে রাজশাহী বাজারগুলো টমেটোর আমদানি বেশি হয়। গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে রাজশাহী ও পাশের অঞ্চল গুলোতে টমেটোর বাম্পার ফলন হয়েছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা। ভালো ফলন ও দাম বেশি থাকায় বাড়তি লাভের আশা করছেন। জেলায় অন্যান্য উপজেলার চেয়ে গোদাগাড়ীতে টমেটোর চাষ হয়ে থাকে। রাজশাহীর চাহিদা মিটিয়ে দেশের টমেটো রাজ্য হিসাবে খ্যাত এই উপজেলা। দেশের বেশিরভাগই টমেটো উৎপাদন হয় এই উপজেলায়। এজন্য “টমেটো রাজ্য” বলা হয় গোদাগাড়ীকে।
এ উপজেলার কৃষকরা জানান, বছরভেদে টমেটোর দাম বেশি-কম হওয়ায় অনেকেই টমেটো চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। তবে বর্তমানে পদ্মা নদীর চরাঞ্চলের কৃষকরা দিন দিন টমেটো চাষের দিকে ঝুকছে। প্রতি বছর চরাঞ্চলে বাড়ছে টমেটোর চাষ। চরাঞ্চলের জমি পলিমাটি হওয়ায় বরেন্দ্র অঞ্চলের চাইতে টমেটোর সাইজ বড় হচ্ছে এবং দাম বেশী পাচ্ছে এ অঞ্চলের টমেটো চাষিরা।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, রাজশাহীতে এবছর ৩ হাজার ১৪৬ হেক্টর জমিতে টমেটো চাষ হয়েছে। তার ভিতরে শুধুমাত্র গোদাগাড়ী উপজেলাতেই চাষ হয়েছে ২ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমি। এই উপজেলায় চলতি বছরে আয় হবে ১১২ কোটি ১৪ লাখ টাকা। কেনা বেচায় অস্থায়ীভাবে ৮ থেকে ৯ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গোদাগাড়ীতে টমেটোর আবাদ হয়েছিল ২ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে। ৬ বছর পরে একই ধারাবাহিকতায় ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে টমেটোর আবাদ চলতি বছরে হয়েছে ২ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে। এসব জমিতে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৪ হাজার ৭৬০ টন। এ বছর গড়ে প্রতি কেজি টমেটো ১৫ টাকা দরে বিক্রি ধরা হলে আয় হবে ১১২ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এসব টমেটো চাষের সঙ্গে সরাসরি জড়িত আট হাজার কৃষক।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জমি থেকেই বিক্রি হয় এসব টমেটো। উৎপাদন ও বিক্রি ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় টমেটো চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা। ফলে টমেমেটাতে আগ্রহ বাড়ছে। সাধারণত আউশ ধান কেটে নেওয়ার পরে টমেটোর চাষ শুরু হয়। গোদাগাড়ী উপজেলায় ১৭-২০ জাতের টমেটোর চাষ হয়। যার মধ্যে বেশিরভাগই হাইব্রিড। তবে অন্য যেকোনো মাঠ ফসলের চেয়ে টমেটো চাষ অত্যন্ত লাভজনক। তবে ভালো ফলন, বীজ ও দাম নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ভয়ে কোনো বছর চাষের হার বেড়েছে আবার কোনো বছর কমেছে।
গোদাগাড়ী উপজেলার পিরিজপুর গ্রামের টমেটো চাষী আকবর বলেন,“আমরা বরাবরই টমেটো চাষ করে থাকি। কোন বছর লাভ হয় আবার কোন কোন বছর ক্ষতিও হয়। তবে চলতি বছরে আমাদের টমেটো চাষ ভালো হয়েছে। আশা করছি এই বছর আমাদের ভালো লাভ হবে।”
একই গ্রামের চাষি সামাদ আলী বলেন,“আমি সাড়ে ৩ বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করেছি সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা লাভ হয়েছে। এখন জমি থেকে টমেটো উত্তোলন করছিনা। টমেটোর দাম নেই। জমি থেকে টমেটো তুলে শ্রমিকের মুজুরি হচ্ছে না। টমেটোর গাছ কেটে ফেলে জমিতে ধান চাষ করবো।’
রাজশাহীর টমেটো ব্যবসায়ী মুক্তার বলেন, এবার ভালো টমেটো আছে। ভালো দাম আছে। প্রতিদিন এক ট্রাক করে টমেটো ঢাকায় পাঠাই। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কুমিল্লায় যাচ্ছে এসব টমেটো। তবে এবার টমেটোর দাম মাঝে মধ্যে কম বেশী হওয়ায় লাভ হলেও লোকসানও হয়েছে। লাভ লোকসান মিলে তেমন লাভ হয়নি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মরিয়ম আহমেদ বলেন, এই অঞ্চলে দুবার টমেটোর চাষ হয়। এরমধ্যে গ্রীষ্মকালীন টমেটো রয়েছে। এই টমেটোর বেশি দাম পান চাষিরা। এবছর এই টমেটো ১৫-১৬০ টাকা কেজি দরে বাজারে বিক্রি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গড়ে ১৫ টাকা কেজি করে বিক্রি ধরা হলে আয় হবে ১১২ কোটি ১৪ লাখ টাকা। শুধু তাই নয়, টমেটো বেচাকেনাকে কেন্দ্র অস্থায়ীভাবে ৮ থেকে ৯ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন,“এইবছর রাজশাহীতে ৩ হাজার ১ শো ৪৬ হেক্টর জমিতে টমেটো চাষ হয়েছে। বর্তমানে যে আবহাওয়া আছে তা টমেটো চাষে অনূকুল। আমরা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে চাষীদের নিয়মতি খোঁজখবর রাখছি। বিভিন্ন কোম্পানি যাতে ভালো বীজ কৃষকদের সরবরাহ করে এই বিষয়ে আমাদের কঠোর মনিটরিং ছিল। এছাড়াও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে কৃষকদের সহযোগীতা ও পরামর্শ অব্যহত রয়েছে।”
মন্তব্য করুন