পরীক্ষামূলক
LIVE TV

ট্রাম্পের ইউক্রেন-রাশিয়া শান্তিচুক্তি ও পশ্চিমা টানাপোড়েন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার সময়ই বলেছিলেন তিনি নির্বাচিত হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটাবেন। সেই প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে তিনি উভয় দেশের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন, বৈঠকও করেছেন। সেই সব উদ্যোগে তাৎক্ষণিক কোনো ফলাফল না পাওয়া গেলেও তিনি এবার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা বা পিস ডিল ও ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত এই বিষয়ে সিদ্ধান্তের সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছেন। তাঁর এই প্রস্তাবনা মার্কিন কূটনৈতিক মহল, ইউক্রেন এবং ইউরোপের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে বেশ উত্তেজনা ও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। চুক্তির বিষয়ে ট্রাম্পের মূল বক্তব্য হচ্ছে–যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে কেউ লাভবান হবে না, অতএব দ্রুত সমঝোতা ছাড়া শান্তি অসম্ভব। সমঝোতার কাঠামো কেমন হবে এ প্রশ্নে তৈরি হয়েছে পশ্চিমা দুনিয়ায় বড় ধরনের মতপার্থক্য।

ট্রাম্পের পিস ডিল নিয়ে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আলোচনার জন্য ইউক্রেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সূত্র বলছে, ট্রাম্পের পরিকল্পনার ২৮ দফাকে ১৯ দফায় আনা হয়েছে। আলোচনায় অংশ নেওয়া জেলেনস্কির প্রতিনিধি ও তাঁর ইউরোপের মিত্ররা কয়েকটি বিষয়ে তাদের আপত্তি ও বিরোধিতার কথা জানালেও তারা ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা ও প্রস্তাবকে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত বলে মনে করেন। যে বিষয়গুলোতে বিতর্ক-আপত্তি বিদ্যমান সেগুলো হচ্ছে–ইউক্রেনের ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে তুলে দেওয়া; ইউক্রেনের সৈন্য সংখ্যা সীমিতকরণ; ন্যাটোতে যোগদানের ইচ্ছা পরিত্যাগ করা; ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য ইস্যুতে ছাড় দেওয়া; ইউক্রেনের জাপোরিঝিয়া পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাগাভাগি; চুক্তির ১০০ দিনের মধ্যে ইউক্রেনের নির্বাচন।

ট্রাম্পের শান্তিচুক্তি ও শক্তির রাজনীতি
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই পিস ডিলের দৃষ্টিভঙ্গিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। ১. যুদ্ধ বন্ধে দ্রুত একটি চুক্তি সম্পাদন করা, সেক্ষেত্রে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় দেশকে কিছু ছাড় দিতে হবে, বিনিময়ে মস্কো তাদের আঞ্চলিক ও ইউক্রেন পাবে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।

২. এই যুদ্ধ বন্ধে ভূখণ্ড-সমঝোতা একটি অনিবার্য শর্ত ও বিষয়। ট্রাম্প প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তার কথায় এই বিষয়টি পরিষ্কার যে, ইউক্রেনের অংশ ক্রিমিয়া ও ডোনবাস কার্যত রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকার বিষয়টি মূলত তাদের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে স্বীকার করে নেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।

৩. ইউক্রেনকে পশ্চিমা সহায়তার সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উপলব্ধি করা। ট্রাম্প তাঁর একাধিক ভাষণে ইঙ্গিত করেছেন যে ইউরোপ যদি তাদের নিজেদের ঘর রক্ষায় নিজেরা বিনিয়োগ না করে তাহলে আমেরিকা তাদের এই যুদ্ধের বোঝা একা বহন করবে না। ট্রাম্পের এমন বক্তব্য ও পিস ডিলের এই চাপকে অনেক পশ্চিমা সমালোচক শান্তি নয় বরং চাপের কৌশল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ইউক্রেনের অবস্থান
প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও ইউক্রেনের কূটনীতিকরা ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমাধানের এই ফর্মুলাকে অত্যন্ত সন্দেহের চোখে দেখছেন। জেলেনস্কির বক্তব্য ও যুক্তি হচ্ছে, রাশিয়ার দখলকৃত ভূখণ্ডকে বৈধতা দান করা মানে তাদের আগ্রাসনকে পুরস্কৃত করা। ইউক্রেন রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতা করতে প্রস্তুত কিন্তু ভূখণ্ড বিনিময় ও ভবিষ্যতে ন্যাটোমুখী হওয়ার সম্ভাবনাকে বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে একটি বিপজ্জনক সীমারেখা তৈরি করা হচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়া সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার কারণে বাড়তি দাবি করছে, আর তাদের চাপের মুখে চুক্তির মাধ্যমে ইউক্রেনকে ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। এই বিষয়ে ইউক্রেনের সামরিক ও বেসামরিক বিশ্লেষকদের মতামত হচ্ছে, ট্রাম্পের মডেল মূলত ‘শীতল দ্বন্দ্ব’ তৈরি করবে, যা ভবিষ্যতে নতুন যুদ্ধের বীজ বপন করবে।

ইউরোপের নেতাদের মতভিন্নতা
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতে এই বিষয়ে তিন ধরনের মতামত বা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। প্রথম পক্ষের মধ্যে আছে পোল্যান্ড, বাল্টিক রাষ্ট্র ও ফিনল্যান্ড। এ বিষয়ে তাদের আছে প্রবল বিরোধিতা। এই দেশগুলোর বক্তব্য হচ্ছে রাশিয়াকে সামরিকভাবে প্রতিরোধ করা ছাড়া এখানে কোনো নিরাপত্তা আসবে না। তারা মনে করে ট্রাম্পের এই পিস ডিল ইউক্রেনকে দুর্বল করবে এবং পরে রাশিয়া বাল্টিক অঞ্চলে অগ্রসর হবে।

দ্বিতীয় পক্ষে আছে ফ্রান্স, জার্মানি। তারা এই বিষয়ে তাদের সতর্ক উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে তাদের অভিমতকে অনেকটা বাস্তববাদী মনে করা হচ্ছে। তাদের যুক্তি হচ্ছে, কোনো পক্ষেরই কূটনৈতিক তৎপরতাকে অস্বীকার করা উচিত নয়। কেননা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউরোপের অর্থনীতি এখন ক্লান্ত, এর একটি রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, যে কোনো ধরনের শান্তি ইউক্রেনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মাখোঁ বলেছেন, ইউক্রেনের সেনাবাহিনী ছোট করা হলে রাশিয়া তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ভবিষ্যতে আগ্রাসন চালাতে পারে। তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়াসকে স্বাগত জানান।

তৃতীয় পক্ষের অবস্থান অনেকটা কৌশলগত নীরবতা। এদের মধ্যে আছে হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়ার মতো দেশ। এই সব দেশের নেতৃত্ব বরাবরই রাশিয়ামুখী ও ট্রাম্পবান্ধব। তাদের বক্তব্য যে ধরনের সমাধান ফর্মুলা যুদ্ধ থামাতে সক্ষম, তারা তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতামত
এই বিষয়ে তিন ধরনের মতামত লক্ষ্য করা যায়। প্রথমত, প্রখ্যাত মার্কিন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গবেষক জন মিয়ারশাইমার ও স্যামুয়েল চারাপের মতে, ইউক্রেনের জন্য সামরিক পথে সমাধানে পৌঁছানো কঠিন। রাশিয়া কোনোভাবেই তার পশ্চিম সীমান্তে ন্যাটোর প্রভাব মেনে নেবে না। তাই দীর্ঘ মেয়াদে সংকটময়, বিপজ্জনক নয় কিন্তু কার্যকর এমন কোনো সমঝোতাই হবে তাদের জন্য টেকসই। তাদের মতে, ট্রাম্পের ডিল অতিরিক্ত সরলীকৃত কিন্তু এটাই মূল সত্য। যুদ্ধের শেষ কূটনীতিতেই হয়। একে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

দ্বিতীয়ত, এক্ষেত্রে প্রখ্যাত মার্কিন লেখক, ইতিহাসবিদ ও অধ্যাপক টিমোথি স্নাইডার এবং সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ অ্যান অ্যাপলবাম প্রমুখের ধারণা আবার সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা মনে করেন, ভূখণ্ড ত্যাগ করা মানে ইউরোপীয় নিরাপত্তাকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করা। ইউক্রেনের ভূখণ্ড রাশিয়াকে দেওয়া হলে তারা হয়তো তখন আরও অগ্রসর হতে উৎসাহিত হবে। তাদের মতে, ট্রাম্পের ডিল শান্তি নয় বরং ইউক্রেনকে পশ্চিম থেকে বিচ্ছিন্ন করে রুশ এজেন্ডায় যুক্ত করা।
তৃতীয়ত, রাশিয়াস্টাডিজ বিশেষজ্ঞরা যুক্তি দিচ্ছেন, রাশিয়ার রাজনৈতিক কাঠামো এমন যে, কোনো দুর্বল চুক্তি ক্রেমলিনকে বিজয় দাবি করার সুযোগ দেবে, তবে ভবিষ্যৎ সংঘাত আরও দীর্ঘ হতে পারে। অন্যদিকে কিছু গবেষক এমনও মনে করেন যে, পুতিন-পরবর্তী কোনো শাসক না আসা পর্যন্ত প্রকৃত শান্তি অসম্ভব।

শান্তিচুক্তির ভবিষ্যৎ কী?
সবশেষে বলা যায় ট্রাম্পের পিস ডিল যে প্রশ্নগুলোকে উন্মুক্ত রেখেছে তা হচ্ছে–ইউক্রেন কি নিরাপত্তা গ্যারান্টি ছাড়া কোনো সমঝোতা মানবে? ইউরোপ কি ট্রাম্পের শর্ত ও পিস ডিল মেনে কিয়েভকে চাপ দেবে? রাশিয়া কি শান্তিচুক্তির প্রশ্নে কোনো রাজনৈতিক ছাড় দিতে প্রস্তুত? এই মুহূর্তে এই প্রশ্নের উত্তরগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার তা হচ্ছে ট্রাম্প যুদ্ধ থামাতে দ্রুত একটি চুক্তি চাচ্ছেন। আর ইউক্রেন ও ইউরোপ সতর্ক যে, তাড়াহুড়ো করে করা যে কোনো শান্তিচুক্তি ভবিষ্যতে আবার যুদ্ধ ডেকে আনতে পারে। শান্তির পথ তাই শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, বিশ্ব রাজনীতির শক্তি-সমীকরণ, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও নির্ভর করছে।

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন