গাইবান্ধা প্রতিনিধি 
আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে গেছে গৃহস্থালির কাজের ধরন। রান্নায় মসলা বাটার ঝক্কি কমাতে এখন সবার ভরসা ইলেকট্রিক ব্লেন্ডার কিংবা বাজারের গুঁড়ো মসলা। তবে প্রযুক্তির এই জয়জয়কারের যুগেও গাইবান্ধা সদর উপজেলার পুলবন্দি এলাকার বাসিন্দা মনোরঞ্জন আঁকড়ে ধরে আছেন তাঁর বাপ-দাদার আমলের ঐতিহ্যবাহী পেশা-শিলপাটা ধার কাটা। হাতুড়ি আর ছেনির ঠোকাঠুকির ছন্দেই প্রতিদিন তিনি বুনে চলেন পরিবারের জীবিকার স্বপ্ন।
প্রতিদিন ভোর হতেই কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়েন মনোরঞ্জন। ব্যাগের ভেতর রয়েছে তাঁর উপার্জনের একমাত্র সম্বল-কয়েকটি লোহার ছেনি ও হাতুড়ি। গ্রামের মেঠোপথ কিংবা শহরের অলিগলিতে হেঁটে হেঁটে চিরচেনা সুরে হাঁক ছাড়েন, “শিল ধার করাবেন, নোড়া ধার করাবেন!” কখনো কখনো হ্যান্ড মাইকেও তুলে ধরেন তাঁর উপস্থিতির বার্তা।
সেই ডাক শুনে গৃহিণীরা এগিয়ে এলে শুরু হয় মনোরঞ্জনের কর্মযজ্ঞ। দীর্ঘদিন মসলা পিষতে পিষতে পিচ্ছিল হয়ে যাওয়া পাথরের বুকে নিখুঁত দক্ষতায় ছেনির আঘাত হানেন তিনি। পরম যত্নে খোদাই করে তৈরি করেন ছোট ছোট খাঁজ, যাতে মসলা দ্রুত ও মিহিভাবে বাটা যায়।
স্ত্রী ও দুই ছেলে নিয়ে মনোরঞ্জনের চার সদস্যের সংসার। ব্লেন্ডারের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে শিলপাটার কদর এখন অনেকটাই কমেছে, সংকুচিত হয়েছে তাঁর কাজের পরিধিও। তবুও সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গ্রাম-মহল্লা ঘুরে দিনশেষে তাঁর আয় হয় চার থেকে পাঁচশ টাকা।
মনোরঞ্জন বলেন, “আগের মতো শিলপাটার কাজ এখন আর পাওয়া যায় না। তবুও দিনশেষে যা পাই, তা দিয়ে টেনেটুনে বেশ ভালোভাবেই ডাল-ভাতের সংসার চলে যায়। সৎভাবে ঘাম ঝরিয়ে পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতে পারার মধ্যেই আমার পরম শান্তি।”
আধুনিকতার আগ্রাসনে গ্রামীণ জীবনের এই লোকজ কারিগররা আজ বিলুপ্তির পথে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও মনোরঞ্জনের মতো মানুষেরা প্রতিদিন প্রমাণ করে চলেছেন-পরিশ্রম ও সততা থাকলে কোনো কাজই ছোট নয়।
মন্তব্য করুন