নীলফামারী প্রতিনিধি 

স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন ষাটোর্ধ্ব খাদিজা বেগম। দুই সন্তানকে নিয়ে শুরু হয় তার নতুন সংগ্রাম। ছেলের পরামর্শে বাড়ির পেছনের পরিত্যক্ত জমি ও বাঁশঝাড় পরিষ্কার করে ২০১৮ সালে গড়ে তোলেন ফলের বাগান। সেই বাগানই এখন তার স্বপ্ন ও সাফল্যের ঠিকানা।
নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার কৈমারী ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা খাদিজা বেগম বর্তমানে কফি, রাম্বুটান, অ্যাভোকাডো, কোকো, প্যাশন ফলসহ বিভিন্ন বিদেশি ফল ও অপ্রচলিত ফসল চাষ করছেন। পাশাপাশি উৎপাদিত ফল ও চারা প্রক্রিয়াজাত ও বিপণন করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন সফল নারী কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে।
কৃষিতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ও সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ইতোমধ্যে জয়িতা পুরস্কার ও জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কার অর্জন করেছেন তিনি। পেয়েছেন নিরাপদ খাদ্য উৎপাদক হিসেবেও সনদ।

জানা যায়, ২০১৪ সালে স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে সংসারের পুরো দায়িত্ব খাদিজা বেগমের ওপর এসে পড়ে। স্বামীর রেখে যাওয়া ব্যবসার পাশাপাশি সন্তানদের লেখাপড়া, সংসার ও কৃষিকাজ সামলাতে শুরু করেন তিনি। ২০১৮ সালে ছেলের পরামর্শে বাড়ির পেছনের পরিত্যক্ত জমি পরিষ্কার করে শুরু করেন ফলের বাগান।
২০১৯ সালে তার বাগানে যুক্ত হয় প্রায় ৬৮০টি কফি গাছ। দুই বছরের মাথায় গাছে ফল আসলে বিষয়টি নজরে আসে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের। পরে কৃষি বিভাগ তাকে উন্নত জাতের কফির চারা ও কফি প্রক্রিয়াজাতকরণের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে। বর্তমানে বাগানের উৎপাদিত ফল, কফি ও বিভিন্ন জাতের চারা স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি অনলাইন ও অফলাইনে বিক্রি করছেন তিনি।
খাদিজা বেগম বলেন, ‘২০১৪ সালে স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই ছেলেকে নিয়ে সংসার চালানোর দায়িত্ব আমার ওপর পড়ে। স্বামীর ব্যবসায় বসা, সংসার চালানো, ছেলেদের লেখাপড়া, বাগান ও শ্রমিকের খরচ—সবকিছুই আমাকে সামলাতে হয়েছে। আমার বড় ছেলে একদিন বলল, বাড়ির পাশে পড়ে থাকা জমি পরিষ্কার করে বাগান করা যায়। এরপর ড্রাগন ফল, রাম্বুটান ও অ্যাভোকাডো দিয়ে বাগান শুরু করি। ধীরে ধীরে কফিসহ বিভিন্ন বিদেশি ফল চাষে যুক্ত হই।’
তিনি জানান, প্রথম দিকে প্রায় ৬৮০টি কফি গাছ থেকে প্রায় ১০ কেজি কফি উৎপাদন হয়। বিষয়টি কৃষি বিভাগের নজরে আসার পর তারা উন্নত জাতের কফির চারা দেন। পরবর্তীতে সেসব গাছ থেকেও ভালো ফলন পেতে শুরু করেন। রাম্বুটান চাষের সাফল্যও রয়েছে তার ঝুলিতে। বাগানে প্রায় ২০টি রাম্বুটানের চারা লাগালেও এর মধ্যে আটটি গাছ মারা যায়। বর্তমানে রয়েছে ১২টি গাছ। গত মৌসুমে মাত্র পাঁচটি গাছ থেকে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকার রাম্বুটান বিক্রি করেছেন বলে জানান তিনি।
খাদিজা বেগম বলেন, ‘উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে কিছু ফলের বাজারদর কমেছে। তারপরও নিরাপদ ও সতেজ ফল উৎপাদনের লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এখন মানুষ আমাদের বাগানের চারা নিতে যোগাযোগ করছেন।’
তার ছেলে শেফায়েত নাশরাত নয়ন বলেন, ‘আম্মুর সহযোগিতায় আমাদের বাগান অনেক বড় হয়েছে। আমরা বিভিন্ন ধরনের অপ্রচলিত বিদেশি ফল নিয়ে কাজ করছি। কৃষি বিষয়ে আমার যে পড়াশোনা রয়েছে, সেটিও এই বাগানে বাস্তবে কাজে লাগাতে পারছি। তবে এই বাগান গড়ে তোলার পেছনে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেছেন আমার মা।’
জানা যায়, কফি, রাম্বুটান ও কোকো চাষে সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে খাদিজা বেগম ২০২২ সালে জয়িতা পুরস্কার লাভ করেন। একই বছর মৎস্য চাষেও জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কার অর্জন করেন তিনি।

নীলফামারীর জেলা প্রশাসক নায়িরুজ্জামান বলেন, ‘অপ্রচলিত বিদেশি ফল একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি যেভাবে সফলভাবে উৎপাদন করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। কফি প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য ইতোমধ্যে তাকে একটি মেশিন দেওয়া হয়েছে। অল্প সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা সব সময় তার পাশে আছি। আগামীতে বেগম রোকেয়া পদকের জন্যও তার নাম মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।’
স্বামী হারানোর পর যে নারীকে সংসারের বোঝা কাঁধে নিয়ে নতুন করে পথচলা শুরু করতে হয়েছিল, সেই খাদিজা বেগমই আজ নিজের শ্রম, সাহস ও উদ্যোগে হয়ে উঠেছেন অন্য নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
মন্তব্য করুন