নাটোর প্রতিনিধি 

নাটোর সদর উপজেলার ছাতনী ইউনিয়নের ভাটোদাঁড়া গ্রামে শুরু হয়েছে প্রায় তিন শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী তিন দিনব্যাপী কালীপূজা ও মেলা। ২৯২ বছরের পুরোনো এই আয়োজনকে ঘিরে উৎসবের আমেজে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। এবারের প্রধান আকর্ষণ ৩৫ ফুট উচ্চতার বিশাল কালী প্রতিমা, যা দেখতে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও দেশের নানা প্রান্ত এবং প্রতিবেশী ভারত থেকেও হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থী ছুটে আসছেন।
নাটোর উত্তরা গণভবনের অদূরে নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের পাশে অবস্থিত ভাটোদাঁড়া কালীবাড়ি চত্বরে শনিবার রাত থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পূজা শুরু হয়েছে। প্রায় ২৫টি পাঁঠা বলির মধ্য দিয়ে পূজার সূচনা হয়। সোমবার রাত পর্যন্ত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান চলবে। মঙ্গলবার বিকেলে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের পূজা ও ঐতিহ্যবাহী মেলা।
পূজাকে কেন্দ্র করে ভাটোদাঁড়া গ্রাম যেন এখন এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভক্ত, দর্শনার্থী ও ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর থাকছে পুরো এলাকা। মন্দির প্রাঙ্গণে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মেলায় বিনোদন ও কেনাকাটার সুযোগও উপভোগ করছেন আগতরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরো কালীবাড়ি চত্বর এবং আশপাশের সড়কজুড়ে বর্ণিল আলোকসজ্জা করা হয়েছে। প্রবেশপথ থেকে শুরু করে মন্দিরের চারপাশ পর্যন্ত রঙিন বাতি ও সাজসজ্জায় উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে। মেলায় বসেছে শতাধিক দোকান। সেখানে রয়েছে মিষ্টি, জিলাপি, খেলনা, প্রসাধনী, পাঁপড়, চটপটি, ফুচকা, নাগরদোলা, শিশুদের বিভিন্ন রাইড, খাট, আলমারি, গৃহস্থালির সামগ্রীসহ নানা ধরনের পণ্যের পসরা। ছোট-বড় সবার উপস্থিতিতে জমে উঠেছে মেলা।
মেলায় ঘুরতে আসা দর্শনার্থী পুলক দাস বলেন, “প্রতিবছরই এখানে আসি। কিন্তু এবার ৩৫ ফুটের বিশাল কালী প্রতিমা আরও আকর্ষণীয় হয়েছে। পরিবেশ খুব সুন্দর এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ভালো।”
মিতালী রানী বলেন, “পরিবারের সবাইকে নিয়ে মেলায় এসেছি। পূজা দেখা, কেনাকাটা এবং সন্তানদের নিয়ে নাগরদোলায় চড়ার আনন্দ একসঙ্গে উপভোগ করছি।”
পলাশ কুমার বলেন, “ভাটোদাঁড়ার কালীপূজা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি আমাদের এলাকার সবচেয়ে বড় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব।”
প্রান্তি রাজ ব্যানার্জি বলেন, “এখানে এলে অন্যরকম ভালো লাগে। এত মানুষের উপস্থিতি এবং উৎসবের পরিবেশ সত্যিই মনোমুগ্ধকর।”
মেলায় জিলাপির দোকান নিয়ে আসা ব্যবসায়ী মিন্টু মোল্লা বলেন, “এই তিন দিনের মেলার জন্য আমরা সারা বছর অপেক্ষা করি। এখানে বিক্রি অনেক ভালো হয়। জেলার বাইরে থেকেও মানুষ আসেন, ফলে ব্যবসাও ভালো হয়।”
খুদে দর্শনার্থী প্রিয়াঙ্কা দাস বলে, “আমি নাগরদোলায় উঠেছি, খেলনা কিনেছি। এত বড় কালী প্রতিমা আগে কখনও দেখিনি। খুব ভালো লাগছে।”
রাজশাহী থেকে আসা শিক্ষক দম্পতি অনুপ রায় ও চৈতালি রায় বলেন, “অনেকদিন ধরে ভাটোদাঁড়ার কালীপূজার কথা শুনে আসছিলাম। এবার প্রথমবার এলাম। বিশাল প্রতিমা, সুন্দর পরিবেশ এবং মানুষের আন্তরিকতা আমাদের মুগ্ধ করেছে।”
প্রতিমাশিল্পী তাপস কুমার পাল জানান, এবারের পূজায় কালীমাতার পাশাপাশি জয়, বিজয়, ডাকিনী, যোগিনী, শিব মহাদেব ও ভৈরবীর প্রতিমাও নির্মাণ করা হয়েছে। কালী ও শিব মহাদেবের প্রতিমার উচ্চতা ৩৫ ফুট। তিনি বলেন, “ভাটোদাঁড়া ছাড়া বাংলাদেশের আর কোথাও ৩৫ ফুট উচ্চতার কালী প্রতিমা নির্মাণ করা হয় না। এই প্রতিমার হাতে রয়েছে শম্ভু রাজার মুণ্ডু এবং গলায় রয়েছে ১০৮টি মুণ্ডমালা। প্রতিমা নির্মাণে কয়েক মাস ধরে একদল কারিগর নিরলস পরিশ্রম করেছেন।”
মেলা উদযাপন কমিটির সহসভাপতি গণেশ চন্দ্র ভট্টাচার্জ জানান, প্রায় ২৯২ বছর আগে কয়েকজন সনাতনী ভক্ত মানত করেছিলেন যে, তাদের মনোবাসনা পূরণ হলে তারা ওই স্থানে কালীমাতার মন্দির প্রতিষ্ঠা করবেন। পরে তাদের মানত পূরণ হলে মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং শুরু হয় তিন দিনব্যাপী কালীপূজা ও মেলার আয়োজন। সেই ঐতিহ্য আজও অব্যাহত রয়েছে এবং প্রতি বছরই এর পরিধি বাড়ছে।
মন্দির কমিটির সভাপতি তপন কুমার পাল বলেন, গত বছর প্রায় ২৮০টি পাঁঠা বলি হয়েছিল। এবার প্রায় ৩০০টি পাঁঠা বলি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভক্তরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানতের পাঁঠা ও ফল নিয়ে আসেন। নির্ধারিত ফি জমা দেওয়ার পর ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী বলি সম্পন্ন করা হয়। পরে পাঁঠার মাথা মন্দিরে রেখে শরীরটি মানতকারীকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব কুমার ঘোষ জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও ভারতের কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ ও মালদহ থেকে বহু ভক্ত এসেছেন। পূজার পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করতে ৩১টি ঢাক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তিন দিনে প্রায় ৬০ থেকে ৭৫ হাজার মানুষের সমাগম হবে।
কালীপূজা ও মেলা উপলক্ষে গঠিত ২৫ সদস্যবিশিষ্ট স্বেচ্ছাসেবক কমিটির আহ্বায়ক পলাশ কুমার বলেন, “দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা রক্ষা ও বিভিন্ন তথ্যসেবা দিতে আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয় মুসলিম যুবকরাও প্রতি বছরের মতো এবারও স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন। এটি সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।”
নিরাপত্তার বিষয়ে নাটোর সদর থানার ওসি মনসুর রহমান বলেন, “পূজা ও মেলায় সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। মণ্ডপ ও মেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ১২টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া সাদা পোশাকের পুলিশও দায়িত্ব পালন করছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে।”
নাটোর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আজাহার আলী বলেন, “ভাটোদাঁড়ার কালীপূজা ও মেলা শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়, এটি নাটোরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই উৎসবকে ঘিরে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে এবং সব ধর্মের মানুষ নির্বিঘ্নে উৎসব উপভোগ করতে পারেন, সে জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকরা সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। আমরা আশা করছি, সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবারের আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন হবে।”
মন্তব্য করুন