নাটোর প্রতিনিধি 

নাটোরের লালপুর উপজেলার শ্রী সুন্দরী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে বৃষ্টিজনিত জলাবদ্ধতায় আবারও ব্যাহত হয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম। শ্রেণিকক্ষে হাঁটুসমান পানি জমে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই পাঠদান বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আর ছুটি পেয়ে বিদ্যালয় মাঠ ও প্রাঙ্গণে জমে থাকা পানিতে মাছ ধরায় মেতে ওঠে শিক্ষার্থীরা। একদিকে শিক্ষার পরিবেশ বিপর্যস্ত, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের মাছ ধরার দৃশ্য এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত রাত থেকে টানা ভারী বর্ষণের কারণে বিদ্যালয় চত্বর, খেলার মাঠ ও শ্রেণিকক্ষগুলো পানিতে তলিয়ে যায়। পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারেনি। ফলে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবন ও মাঠে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। সকালে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে উপস্থিত হলেও পানিবন্দি পরিবেশের মধ্যেই তাদের ক্লাসে অংশ নিতে হয়।
বিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী বিকেল ৪টা পর্যন্ত পাঠদান চলার কথা থাকলেও সকাল থেকেই পরিস্থিতি ছিল অস্বাভাবিক। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবারও বৃষ্টি শুরু হলে শ্রেণিকক্ষের ভেতরে পানি আরও বৃদ্ধি পায়। একপর্যায়ে বেঞ্চের নিচ পর্যন্ত পানি উঠে গেলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। পরে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ছুটি ঘোষণা করে।
ছুটি ঘোষণার পরপরই অনেক শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয় মাঠে জমে থাকা পানিতে মাছ ধরতে দেখা যায়। কেউ ছোট জাল, কেউ ছাঁকনি, আবার কেউ হাত দিয়েই মাছ ধরার চেষ্টা করে। বিদ্যালয়ের মাঠে শিক্ষার্থীদের এমন ব্যতিক্রমী কর্মকাণ্ড দেখতে স্থানীয় উৎসুক মানুষও ভিড় করেন। অনেকেই মোবাইল ফোনে সেই দৃশ্য ধারণ করেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, যে মাঠে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা করার কথা, সেই মাঠ এখন ছোট জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। আর যেখানে শিক্ষার্থীদের বই-খাতা হাতে শ্রেণিকক্ষে থাকার কথা, সেখানে তারা কোমরসমান পানিতে নেমে মাছ ধরছে। বিদ্যালয়ের এমন দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, “বৃষ্টি হলেই আমাদের ক্লাসরুমে পানি ঢুকে যায়। বেঞ্চে বসতে সমস্যা হয়, বই-খাতাও ভিজে যায়। আজ পানি বেশি হওয়ায় ক্লাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরে আমরা কয়েকজন মাঠে মাছ ধরতে নেমেছি।”
একজন অভিভাবক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু প্রতি বছর বর্ষা এলেই একই অবস্থা তৈরি হয়। সন্তানদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খাজা মুহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, “সমস্যাটি দীর্ঘদিনের। আমরা বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি। কিন্তু এখনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। ভারী বৃষ্টি হলেই বিদ্যালয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং অনেক সময় পাঠদান বন্ধ রাখতে হয়। শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে আমরা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছি।”
লালপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাবিবুল বাশার বলেন, “বিদ্যালয়টির জলাবদ্ধতার বিষয়টি আমাদের জানা আছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয়, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করা হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দা ও সমাজকর্মী মো. আব্দুল কাদের বলেন, “একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে হাঁটু পানি জমে থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। শিক্ষার্থীরা মাছ ধরছে—দৃশ্যটি হয়তো মজার, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে অবহেলা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা। দ্রুত ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন ও মাঠ উঁচুকরণের কাজ শুরু করা জরুরি।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যায় ভুগলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে জলাবদ্ধতা আরও প্রকট হয়ে উঠছে। তারা বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দ্রুত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ, মাঠ ভরাট ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে প্রতি বর্ষায় শিক্ষার্থীদের এমন দুর্ভোগ অব্যাহত থাকবে এবং শিক্ষা কার্যক্রম আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মন্তব্য করুন