আরসিটিভি ডেস্ক 

জরাজীর্ণ টিনের ঘর। বৃষ্টির পানি পড়লে যেখানে রাত কাটানোই কঠিন হয়ে পড়ে, সেই ঘরের এক কোণে নিথর হয়ে শুয়ে আছেন বাবলী আক্তার (৩৮)। মুখে অসহনীয় যন্ত্রণার ছাপ, শরীরজুড়ে অসুস্থতার ভার। মাঝে মাঝে ব্যথায় কাতর হয়ে ওঠেন, আবার নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ে চোখের পানি। তিন সন্তানের জননী এই নারী আজ জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে কেবল আশার আলো খুঁজছেন।
দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে ভুগছেন বাবলী আক্তার। প্রথমে সাধারণ অসুস্থতা মনে হলেও ধীরে ধীরে তার অবস্থা ভয়াবহ রূপ নেয়। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে জানা যায়, তার দুটি কিডনিই প্রায় অচল। সেই খবর শোনার পর থেকেই যেন থমকে যায় পুরো পরিবার। ভেঙে পড়ে তাদের ছোট্ট সংসারের স্বপ্ন
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বাবলীকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে নিয়মিত ডায়ালাইসিস অপরিহার্য। সপ্তাহে অন্তত তিনবার ডায়ালাইসিস না করলে তার জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে। কিন্তু প্রতিবার ডায়ালাইসিসে খরচ হয় প্রায় ৪ হাজার টাকা অর্থাৎ সপ্তাহে প্রায় ১২ হাজার টাকা, যা এই দরিদ্র পরিবারের জন্য একেবারেই অসম্ভব।
বাবলীর স্বামী আনারুল ইসলাম একজন রিকশাচালক। সারাদিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে রিকশা চালিয়ে যা আয় করেন, তা দিয়ে কোনোমতে সংসারের নিত্যপ্রয়োজন মেটানোই কঠিন। তিন সন্তান নিয়ে জীবন চালানো যেখানে চ্যালেঞ্জ, সেখানে স্ত্রীর এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি, মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, ধার করছেন, সাহায্যের হাত বাড়াচ্ছেন, শুধুই স্ত্রীর প্রাণ বাঁচানোর আশায়।
ঠাকুরগাঁও রিকশা ও ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, বাবলী আক্তার প্রায় এক বছর ধরে কিডনি রোগে ভুগছেন। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে পরিবারটি তাদের সহায়-সম্বল এমনকি বসতঘর পর্যন্ত বিক্রি করে এখন নিঃস্ব হয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা যতটুকু পেরেছেন সহযোগিতা করেছেন, কিন্তু বর্তমানে তার চিকিৎসা অব্যাহত রাখতে বড় অংকের অর্থের প্রয়োজন। তিনি সমাজের বিত্তবান ও হৃদয়বান মানুষদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান, যাতে এই অসহায় মায়ের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়।
প্রতিবেশী আসমা আক্তার বলেন, বাবলী দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ। এখন তাকে সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস করাতে হচ্ছে। এই চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে পরিবারটি সবকিছু হারিয়েছে। বসতভিটা, জমিজমা সব বিক্রি করে তারা আজ নিঃস্ব। তিনটি ছোট সন্তান নিয়ে পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। আমরা এলাকাবাসী হিসেবে যতটুকু পেরেছি করেছি, কিন্তু এখন প্রয়োজন বৃহৎ সহায়তা। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে হয়তো বাবলীর জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।
বাবলীর স্বামী আনারুল ইসলাম বলেন, শুরুতে বুঝতেই পারিনি রোগটা এত ভয়ংকর হবে। পরে ডাক্তার জানালেন তার দুটি কিডনিই প্রায় অচল। চিকিৎসক বলেছেন, প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা লাগবে তাকে বাঁচাতে। আমি একজন রিকশাচালক, এত টাকা আমার জীবনে কল্পনাও করা যায় না। প্রতিদিন ৪০০ টাকার ওষুধ লাগে, সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস করতে হয়, খরচ ১২ হাজার টাকা। অনেক সময় টাকার অভাবে চিকিৎসা বন্ধ রাখতে হয়, তখন স্ত্রীর যন্ত্রণা আমি সহ্য করতে পারি না। বর্তমানে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করাচ্ছি, সেখানে প্রতিমাসে নিয়ে যেতে হয়।
তিনি আরও বলেন, আমার শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করে দিয়েছি। এখন ভাড়া বাসায় থাকি, তিন সন্তান নিয়ে কোনো রকমে বেঁচে আছি। একদিন রিকশা না চালালে ঘরে খাবার থাকে না। সন্তানদের মুখের দিকে তাকালে বুক ফেঁটে যায়। আমি কারও কাছে ভিক্ষা চাই না, শুধু আমার স্ত্রীর জীবনটা বাঁচাতে চাই।
সাবেক পৌর কাউন্সিলর মো. রমজান আলী বলেন, আমি তাদের ব্যক্তিগতভাবে চিনি, তাদের বাড়িটি আমার পাশেই। অত্যন্ত অসহায় একটি পরিবার। বাবলী আক্তার দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে ভুগছেন। দিন দিন তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটছে। চিকিৎসা করানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের একেবারেই নেই। যা কিছু ছিল, সবই চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়ে গেছে। এখন পরিবারটি চরম মানবিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে। আমরা এলাকাবাসী হিসেবে যতটুকু পেরেছি সহযোগিতা করেছি, কিন্তু এই চিকিৎসা অব্যাহত রাখতে বড় পরিসরে সহায়তা প্রয়োজন।
ঠাকুরগাঁও জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোছা. সাইয়েদা সুলতানা বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত মানবিক ও হৃদয়বিদারক। সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় গুরুতর অসুস্থ ও অসহায় রোগীদের জন্য সহায়তার সুযোগ রয়েছে। নির্ধারিত নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন দাখিল করা হলে আমরা বিষয়টি দ্রুত যাচাই-বাছাই করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আমরা ইতোমধ্যে এটি সম্পর্কে অবগত হয়েছি। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও কাগজপত্র সংগ্রহ করে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবেদন করা হলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়ম অনুযায়ী সহায়তা প্রদানের চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা কার্যক্রমের আওতায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাবলী আক্তারের বিকাশ নম্বর ০১৭৮৭৫৫৬১৩১। কেউ চাইলে এই নম্বরে যোগাযোগ করে সাহায্য পাঠানে পারেন।
মন্তব্য করুন