পরীক্ষামূলক
LIVE TV

ভারতের খাদ্য সংকট কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রন্থাগারগুলোকে সমৃদ্ধ করেছিল

১৯৯৬ সালে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর রেজেনস্টাইন গ্রন্থাগারে দক্ষিণ এশিয়ার বইয়ের বিশাল সংগ্রহ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন গবেষক অনন্যা বাজপেয়ী। অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, হার্ভার্ড এবং কলম্বিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের দক্ষিণ এশীয় গ্রন্থাগারগুলোর সঙ্গেও তিনি পরিচিত ছিলেন, তবে শিকাগোর সংগ্রহ তার কাছে অতুলনীয় মনে হয়েছিল।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিশাল সংগ্রহ তৈরির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল আমেরিকার ‘পিএল-৪৮০’ কর্মসূচি, যা ১৯৫৪ সালে চালু করা হয়।

‘পাবলিক ল ৪৮০’ (পিএল-৪৮০), যা ‘ফুড ফর পিস’ নামে পরিচিত, ছিল শীতল যুদ্ধের সময়কার একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ। প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি আইজেনহাওয়ারের স্বাক্ষরিত এই আইনের আওতায় ভারতসহ বিভিন্ন দেশ স্থানীয় মুদ্রায় মার্কিন শস্য কিনতে পারত, যা বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমাত।

বিশেষ করে ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে ভারতের তীব্র খাদ্য সংকটের সময় এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাদ্য সহায়তা পেয়েছিল। এর বিনিময়ে ভারতের স্থানীয় মুদ্রার যে তহবিল তৈরি হতো, তা দিয়ে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দক্ষিণ এশীয় বই, সাময়িকী, ফোনোগ্রাফ রেকর্ড ইত্যাদি সংগ্রহ করত।

পিএল-৪৮০-এর অধীনে ১৯৫৯ সালে দিল্লিতে ৬০ জন ভারতীয় নিয়ে একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়, যারা সরকারি প্রকাশনা, বই ও সাময়িকী সংগ্রহের কাজ করত। প্রথমদিকে শুধু সরকারি প্রকাশনায় মনোযোগ দেওয়া হলেও পরে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার বইও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

গ্রন্থাগারবিদ মরিন এল পি প্যাটারসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৮ সালের মধ্যে ২০টি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় এই কর্মসূচির আওতায় বই ও অন্যান্য উপকরণ সংগ্রহ করতে থাকে।

তবে এত বিশাল সাহিত্যভাণ্ডার থেকে মানসম্মত বই বাছাই করা সহজ ছিল না। এজন্য নির্ভরযোগ্য বই বিক্রেতাদের মনোনীত করা হয়, যারা নির্দিষ্ট ভাষার বই সংগ্রহের দায়িত্ব পান। সন্দেহজনক বই হলে তা দিল্লি অফিসের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হতো।

১৯৬৬ সালের মধ্যে ভারত, পাকিস্তান ও নেপাল থেকে ৭.৫ লক্ষের বেশি বই ও সাময়িকী যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়, যার মধ্যে ভারত থেকেই আসে ৬.৩৩ লক্ষ বই ও অন্যান্য উপকরণ।

১৯৬৭ সালে একটি মার্কিন গ্রন্থাগারের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, এই সংগ্রহে ভারতীয় ইতিহাস, হস্তশিল্প, হিন্দু সংস্কৃতি ও মনোবিশ্লেষণমূলক গবেষণাসহ নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এই কর্মসূচির মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্য ও গবেষণা বিষয়ক বই যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্থান পেলেও, এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য সম্পদ বিদেশে চলে যায়।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৩০টিরও বেশি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় পিএল-৪৮০ কর্মসূচির মাধ্যমে বই সংগ্রহ করেছিল। ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিনের গ্রন্থাগার, যা একসময় পিএল-৪৮০-এর অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত হয়, বর্তমানে দুই লক্ষেরও বেশি বই ধারণ করে।

তবে ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনের লাইব্রেরিয়ান টড মাইকেলসন-আম্বেলাং মনে করেন, এই কর্মসূচির ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জ্ঞানের ভাণ্ডার কিছুটা শূন্য হয়েছে, কারণ অনেক মূল্যবান বই এখন তাদের নিজস্ব গ্রন্থাগারেও পাওয়া যায় না।

ফ্লেম ইউনিভার্সিটির গবেষক মায়া ডডের মতে, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহে এমন অনেক বই রয়েছে, যা ভারতে আর পাওয়া যায় না, এবং প্রতিটি বইতে ‘পিএল-৪৮০’ চিহ্ন দেওয়া রয়েছে।

পিএল-৪৮০ কর্মসূচি ভারতকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দক্ষিণ এশীয় গবেষণার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। যদিও এটি একসময় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভজনক ছিল, তবে এর ফলে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে মূল্যবান সাহিত্য ও গবেষণাসম্পদ স্থানান্তরিত হয়েছে, যা গবেষকদের কাছে বিতর্কিত বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন