RCTV Logo নাটোর প্রতিনিধি
২৪ জুন ২০২৬, ১:১০ অপরাহ্ন

চলনবিলের বুকে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী চৌগ্রাম জমিদার বাড়ি, সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে শত বছরের ঐতিহ্য

ছবিঃ আরসিটিভি

নাটোরের সিংড়া উপজেলার চৌগ্রাম ইউনিয়নে অবস্থিত ঐতিহাসিক চৌগ্রাম জমিদার বাড়ি আজও বহন করে চলেছে বাংলার জমিদারি ঐতিহ্যের অসংখ্য স্মৃতি। একসময় যে প্রাসাদে জমিদারদের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, বিচার-সালিশ, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং সামাজিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতো, সেই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি এখন কালের বিবর্তনে অনেকটাই জীর্ণ ও ধ্বংসপ্রায়। তবুও ইতিহাসপ্রেমী মানুষ, গবেষক ও পর্যটকদের কাছে চৌগ্রাম জমিদার বাড়ি এখনো একটি আকর্ষণীয় নাম।

চলনবিল অধ্যুষিত অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জমিদারি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে পরিচিত চৌগ্রাম জমিদার বাড়ি। প্রায় তিনশ বছরের পুরোনো এই রাজবাড়ি শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সামাজিক পরিবর্তনের একটি জীবন্ত দলিল। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেখতে আসেন। বিশেষ করে শীত মৌসুম ও ছুটির দিনে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় বেশি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অষ্টাদশ শতাব্দীতে চৌগ্রাম জমিদারির গোড়াপত্তন হয়। সেই সময় জমিদার পরিবার এখানে বিশাল পরিসরে রাজবাড়ি নির্মাণ করে জমিদারি কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠা এই প্রাসাদ কমপ্লেক্সে ছিল আবাসিক ভবন, কাছারি ভবন, অতিথিশালা, মন্দির, পুকুর এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক স্থাপনা। স্থাপত্যশৈলীতে মুঘল ও ইউরোপীয় নির্মাণরীতির প্রভাবও দেখা যায়।

একসময় এই জমিদার বাড়ি ছিল এলাকার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। জমিদার পরিবারের উদ্যোগে শিক্ষা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। এলাকার উন্নয়ন ও সামাজিক নেতৃত্বে জমিদার পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে প্রবীণরা জানান।

বর্তমানে জমিদার বাড়ির অনেক অংশ ভেঙে পড়েছে। মূল ভবনের দেয়ালে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও ছাদের অংশ ধসে পড়েছে। চারপাশে জন্ম নিয়েছে ঝোপঝাড় ও আগাছা। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি ধীরে ধীরে তার অস্তিত্ব হারানোর পথে রয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল আকারের ভবনের কিছু অংশ এখনো দাঁড়িয়ে থাকলেও অনেক স্থাপনার চিহ্ন প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। পুরনো দেয়াল, খিলান ও অলংকরণগুলো অতীতের গৌরবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ভবনের বিভিন্ন অংশে সময়ের ক্ষতচিহ্ন স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সুইট আলী বলেন, “ছোটবেলা থেকে এই জমিদার বাড়ির ইতিহাস শুনে আসছি। আগে এখানে অনেক মানুষ ঘুরতে আসতো। কিন্তু এখন সংরক্ষণের অভাবে ভবনগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত সংস্কার করা না হলে একসময় হয়তো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।”

স্থানীয় শিক্ষক আব্দুর রশিদ বলেন, “চৌগ্রাম জমিদার বাড়ি শুধু সিংড়া বা নাটোরের নয়, এটি দেশের একটি ঐতিহাসিক সম্পদ। সরকারিভাবে সংরক্ষণ ও সংস্কার করা হলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।”

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, চলনবিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে চৌগ্রাম জমিদার বাড়িকে যুক্ত করে পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

পরিবেশ কর্মী ও সাংবাদিক মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে যেভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, একইভাবে চৌগ্রাম জমিদার বাড়িকেও সংরক্ষণের আওতায় আনা প্রয়োজন। প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় এটি রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।

এ বিষয়ে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় জরিপ পরিচালনা করে জমিদার বাড়ির অবশিষ্ট স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ করবে এবং পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলবে। তাহলে হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহাসিক নিদর্শন নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে টিকে থাকবে।

চৌগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান গোলজার হোসেন গিয়াস বলেন, “চৌগ্রাম জমিদার বাড়ি আমাদের এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক। যথাযথ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা হলে এটি জাতীয় পর্যায়ের পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হতে পারে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।”

ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা চৌগ্রাম জমিদার বাড়ি যেন আজও অতীতের গৌরবগাঁথা শুনিয়ে যাচ্ছে। তবে সময়মতো সংরক্ষণের উদ্যোগ না নেওয়া হলে চলনবিল অঞ্চলের এই অমূল্য ঐতিহ্য একদিন কেবল ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।সিংড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল রিফাত বলেন,”চৌগ্রাম জমিদার বাড়ি সিংড়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এ ধরনের ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব। স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সমন্বয়ে এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটির সংরক্ষণ এবং পর্যটন সম্ভাবনা বিকাশে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছি। চৌগ্রাম জমিদার বাড়িকে ঘিরে পর্যটনবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।”

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী হত্যা, স্বামীর মৃত্যুদণ্ড

হাম ও হামের উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, মোট ৬৮৯

আদালতে ন্যায়বিচার চাইলেন যাহের আলভী

বেইজিং পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

গাইবান্ধায় রেস্টুরেন্ট কর্মচারীর বিরুদ্ধে শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ, উত্তেজিত জনতা, পুরিয়ে দিলো রেস্টুরেন্ট

চীনের দালিয়ান থেকে বুলেট ট্রেনে বেইজিংয়ের পথে প্রধানমন্ত্রী

গোবিন্দগঞ্জে ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়ক সংস্কার, বছর না যেতেই ধস

ঋণের চাপে হতাশা, ঠাকুরগাঁওয়ে গাছে ঝুলে এক ব্যক্তির আত্মহত্যা

গাইবান্ধায় ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত শায়রা কে বাঁচাতে বাবা-মায়ের আকুতি 

গাইবান্ধা শহরে ব্যবসায়ীর বাসায় চুরি, স্বর্ণ ও নগদ টাকা লুট

১০

আদিতমারীতে নন্দিনী হত্যা মামলার আসামির গরু নিলামে বিক্রি করলেন স্কুল মাস্টার

১১

লালমনিরহাটে তিস্তার পানি আবারও কমেছে, নেই বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা

১২

চলনবিলের বুকে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী চৌগ্রাম জমিদার বাড়ি, সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে শত বছরের ঐতিহ্য

১৩

আজ ২৪ জুন, দিনটি কেমন যাবে আপনার?

১৪

কুড়িগ্রাম সীমান্তে ১০ দিন ধরে ৩ যুবকের অবস্থান, দুইজন উধাও

১৫

অধিবেশনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো রাষ্ট্রীয় কাজ নেই

১৬

পুরনো ক্লাবে ফিরছেন সিলভা

১৭

বিশ্ববাজারে সোনা-রুপারর দামে বড় পতন

১৮

স্কুলের টিউবওয়েলের পানি পান করে ৩২ শিক্ষার্থী অসুস্থ

১৯

দেশের ১৩ জেলায় রাতের মধ্যে ঝড় ও বজ্রবৃষ্টির আশঙ্কা

২০