পরীক্ষামূলক
LIVE TV

নদ-নদীর নাব্যতা সংকটে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ

ফুলছড়ির দিগন্তবিস্তৃত চরাঞ্চলের সর্বত্র দেখা যায় ধু-ধু বালুচর। চরবাসীর কাছে এ বালু যেন পথে কাঁটা হয়ে ছড়ানো। শুকনো মৌসুমে এমনই দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ফজলুপুর থেকে কাঁচা কলার কান্দা নিয়ে ফুলছড়ি বাজারে এসেছেন তাইজুদ্দিন। কত দূর থেকে এলেন? জানতে চাইলে তাইজুদ্দিন বলেন, ‘ঘাটা (রাস্তা) হবে ছয়-সাত মাইল। খুব বেশি দূর নোয়ায়। কিন্তুক বালুর কারণে হাঁটা মেলা কষ্ট।’ তার সঙ্গে যখন আলাপ হয়, তখন সেখানে উপস্থিত স্থানীয়রা জানালেন, দূরত্বটা আরও বেশি, প্রায় ১৫ কিলোমিটার। চরের হাট-বাজার ঘুরে ঘুরে সবজি বেচাকেনা করা মানুষটির কাছে পায়ে হাঁটা এই পথও খুব বেশি দূরে মনে হয় না।

শুধু ফুলছড়ি নয়, গাইবান্ধা জেলার ১৬৫টি চরের ৪ লাখ ২০ হাজার মানুষ তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য পূর্ব-পশ্চিমপাড়ের মূল ভূখণ্ডের ৬০টি হাট-বাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। চরের গ্রামগুলোতে প্রাথমিকের পর পড়ালেখার সুযোগ নেই বলে হাইস্কুল ও কলেজপড়ুয়া কমপক্ষে হাজার তিনেক ছেলেমেয়েকে আসতে হয় মূল ভূখণ্ডের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ফুলছড়ি উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে এরেণ্ডাবাড়ি, ফজলুপুর ও ফুলছড়ির পুরোটাই একেবারে দুর্গম চরাঞ্চল। অন্য চার ইউনিয়নের মধ্যে গজারিয়া, উদাখালী, উড়িয়া ও কঞ্চিপাড়ার এক-চুতর্থাংশ চরাঞ্চল; স্থানীয়দের ভাষায় উপজেলার বাকিটা বিল।

নভেম্বর থেকে নদীতে পানি না থাকায় হেঁটে চলতে হয়। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হয় রোগীদের নিয়ে। বছর পাঁচ-ছয়েক হলো ঘোড়াগাড়ি চলছে ফুলছড়ির চরে। ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার পানি সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। এর দরুন নৌ-চলাচল রুটগুলোতে জমেছে বড় ধরণের বালুর স্তর। কার্তিক মাসেই ব্রহ্মপুত্র আর যমুনা নদীর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে জেগেছে ছোট-বড় অসংখ্য চর। বিশাল এলাকাজুড়ে চর দেখে মনেই হয় না এখানে এক সময় উত্তাল ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা ছিল। ব্রহ্মপুত্র নদের কালাসোনা টার্নিং পয়েন্ট নৌ চ্যানেল ভরাট হয়ে পড়েছে। নদের পানি হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার প্রায় ১৮টি নৌঘাট অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

অন্যদিকে, ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্ব চ্যানেল জিগাবাড়ি থেকে মননারচর এবং পশ্চিম চ্যানেল কামারজানি নৌবন্দর থেকে জামিরা পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ৫০ কিলোমিটার এলাকায় ছোট-বড় দুই শতাধিক চর ও ডুবোচর জেগে ওঠায় ফুলছড়ি উপজেলার অভ্যন্তরীণ নৌ-রুটগুলো অচল হতে চলেছে। এর মধ্যে ফুলছড়ি-বালাসী, গজারিয়া-গলনা, সিংড়িয়া-ঝানঝাইর, গুনভরি-কালাসোনা এবং আন্তঃজেলা নৌ-রুট ফুলছড়িঘাট-গুঠাইল, সৈয়দপুর-রাজীবপুর, তিস্তামুখঘাট-আমতলী এবং তিস্তামুখঘাট-সারিয়াকান্দিসহ ছোট-বড় আরও ১৫টি নৌ-রুটে চলাচলকারী যাত্রী ও পণ্যবাহী নৌযান চরম অসুবিধা পড়েছে।

তিস্তামুখঘাট ও বাহাদুরাবাদঘাট নৌরুটে চলাচলকারী নৌকার মাঝি জসিজল হক জানান, নদীর কোথাও হাঁটুপানি আবার কোথাও কোমর পর্যন্ত। পণ্য বোঝাই বা যাত্রী নিয়ে নৌকা গন্তব্যস্থলে যাওয়া খুব মুশকিল হয়ে পড়েছে। ফুলছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আজহারুল ইসলাম লাবলু বলেন, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদী ভাঙনের কারণে চর হয়ে পড়ে মূল-ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন জনবসতি। বর্ষায়-বন্যায় প্লাবিত অর্থাৎ বানভাসি। শুকনো মৌসুমে ধু-ধু বালুকাময় বিরানভূমি। তবু নৌপথে যোগাযোগ সহজ হয় বলে চরাঞ্চলের মানুষের কাছে বর্ষাই অধিক পছন্দের।

স্থানীয় বাসিন্দা শিক্ষক ও সাংবাদিক আতিকুর রহমান বলেন, নদীগুলোর নাব্য সংকটের কারণে পানি ধারণক্ষমতা কমে গেছে। তাই বর্ষা এলেই নদীর দুই কূল উপচে যেমন বৃহত্তর রংপুরের জেলাগুলো ভয়াবহ বন্যার শিকার হয়, তেমনি নদীর কূল অব্যাহত পানির চাপে হয় ভাঙনের সম্মুখীন। ফলে প্রতি বছর হাজার হাজার পরিবার গৃহহারা হয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আনিস হায়দার খান বলেন, নদ-নদীর নাব্যতা সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন