পরীক্ষামূলক
LIVE TV

জনগণের চাওয়া ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। সেদিনই শেখ হাসিনা ভারত পালিয়ে যান। এরপর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ গ্রহণ করে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করে এবং একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করে। আজ শনিবার এসব সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে।

তবে, অন্তর্বর্তী সরকারের ছয় মাস পার হলেও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কারণে অনেক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শ্লথ হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক চক্রান্ত এবং প্রশাসনিক জটিলতার ফলে সরকার এখনো জনগণের প্রত্যাশিত স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারেনি। যদিও সরকার রাজনৈতিক দল ও জনগণের সমর্থন পেয়েছে, কিন্তু প্রতিশ্রুত উন্নয়ন ও সংস্কারের দৃশ্যমান অগ্রগতি অনেকক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ।

আন্দোলন চলাকালে পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে লুট হওয়া ১৩৯২টি অস্ত্র এবং তিন লাখ ৯১ হাজার ৪৩৮ রাউন্ড গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার করা যায়নি। এছাড়া, জেল ভেঙে পালানো ৭০০ অপরাধী অধরা রয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। আহত ও শহিদ পরিবারের সদস্যরা প্রতিশ্রুত আর্থিক সহায়তা, উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব দাবি পূরণের কাজ চলছে, তবে অগ্রগতি খুবই ধীর।

বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এখনো রয়ে গেছে। ফলে সয়াবিন তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বৃদ্ধি করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির হার ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও, পণ্যের দাম এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও, পুলিশের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো দেখা যাচ্ছে না।

জনগণের প্রত্যাশা ছিল, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, গণহত্যার বিচার, ঋণখেলাপি ও অর্থপাচারকারীদের বিচার দ্রুত হবে। সরকার এসব বিষয়ে কাজ শুরু করলেও, সকল ক্ষেত্রে সমান গতিতে এগোতে পারেনি। ফলে ছয় মাসের মাথায় জনগণের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—দেশে কী ঘটছে?

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মতে, সরকার কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে এবং সংস্কার ও গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করতে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। তবে, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এখনও হয়নি, এবং গণহত্যার সঙ্গে জড়িত বড় অপরাধীদের অনেকেই ধরা পড়েনি। বিচারপ্রক্রিয়াও অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে, যা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “গত ছয় মাসে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। যারা দীর্ঘদিন ধরে হত্যা-গুম, ব্যাংক লুট ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিচার এখনও শুরু হয়নি। আইনশৃঙ্খলার অবস্থাও অনিয়ন্ত্রিত।”

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “ফ্যাসিবাদের পতনের পর গঠিত সরকার সংস্কার ও নির্বাচন সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। তবে, জনগণ এর বাস্তব অগ্রগতি দেখতে চায়।”

গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতা বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সরকারের প্রতি জনগণের বিপুল প্রত্যাশা ছিল। তবে, বিচারপ্রক্রিয়া ও অর্থনৈতিক সংস্কারে গতি কম থাকায় জনগণের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।”

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, “আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনীতির উন্নয়নে সরকার কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি। মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, সরকার ১০০-এর মধ্যে ৪০ নম্বরের বেশি পাবে না।”

বাম গণতান্ত্রিক জোটের শীর্ষ নেতা ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোনেন প্রিন্স বলেন, “ছয় মাসে সরকার জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে পারেনি। সরকারের উচিত দ্রুত সংস্কার করে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা।”

বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। ছয় মাসের মধ্যে কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলেও, অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে গতি নেই। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুততর করাই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে, সরকারকে দ্রুত সময়ের মধ্যে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে এবং সংস্কার কার্যক্রমে গতি আনতে হবে।

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন