আরসিটিভি ডেস্ক 

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপটে অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সময়সূচি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকারি ও বেসরকারি অফিসের সময় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ব্যাংকিং কার্যক্রম চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত। একই সঙ্গে মার্কেট ও শপিংমল সন্ধ্যা ৬টার পর বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে খাবারের দোকান, ফার্মেসি ও জরুরি প্রয়োজনীয় সেবার দোকান, কাঁচাবাজার এর আওতামুক্ত থাকবে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিষয়ে আগামী রোববার সিদ্ধান্ত জানাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারে মন্ত্রিসভা বৈঠক-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান। মন্ত্রিসভার বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে রাত সাড়ে ৮টার দিকে মন্ত্রিপরিষদ বৈঠক শুরু হয়ে শেষ হয় সাড়ে ১১টার পরে। বৈঠকে দেশের জ্বালানি সংকট নিয়ে করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পরে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দামের ওঠানামা সামাল দিতে সরকার কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নিয়ে কাজ করছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী তিন মাস সরকারি ব্যয় কমানো হবে।
এ সময়ে সরকারের জন্য নতুন কোনো যানবাহন কেনা হবে না। জলযান, আকাশযান ও কম্পিউটার সামগ্রী কেনাও বন্ধ থাকবে।
তিনি জানান, অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে। সরকারি অর্থায়নে সব বৈদেশিক প্রশিক্ষণ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। সভা-সেমিনারে ব্যয়ও ৫০ শতাংশ কমানো হবে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে সরকারি ব্যয় ৩০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ ব্যয় ৩০ শতাংশ কমাতে বলা হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় রোববার থেকে আলাদা নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়। সব শ্রেণি ও সব প্রতিষ্ঠানের জন্য এক ধরনের সিদ্ধান্ত না নিয়ে আলোচনা করে ধাপে ধাপে নির্দেশনা দেওয়া হবে, যাতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত না হয়।
সব মার্কেট সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত কীভাবে কার্যকর হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মনিটরিং ব্যবস্থা থাকবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এ বিষয়ে কাজ করবে। বিয়ে বা উৎসব উপলক্ষে আলোকসজ্জা নিয়েও কড়াকড়ির কথা জানান সচিব।
জ্বালানি সাশ্রয়ের এই পদক্ষেপ কতদিন চলবে, তা নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি। পরিস্থিতি ও সরকারের সক্ষমতা বিবেচনায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, পরিস্থিতি কত দূর যায়, সেটি দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। যুদ্ধের কারণে সেখানে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে সরবরাহ শুরু হয়েছে, কাজাখস্তান থেকেও সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সরকারি স্কুলে শিক্ষার্থীদের পরিবহনে ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে বৈদ্যুতিক বাস ব্যবহারে উৎসাহ দিতে নতুন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সরকারি স্কুলগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে ইলেকট্রিক বাস ব্যবহারে উৎসাহ দিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যেসব স্কুল এ কার্যক্রমে অংশ নেবে, তারা শুল্কমুক্তভাবে বাস আনতে পারবে। বাণিজ্যিক খাতে এ সুবিধা থাকলেও সেখানে ২০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। পুরোনো বাস নয়, কেবল নতুন বাস আনা যাবে।
সরকারের দপ্তরগুলোতেও কাজের চাপ বেড়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। নাসিমুল গণি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে কাজের সময় অনেক বেড়ে গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার সাধারণ মানুষের ওপর চাপ যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে চায়। একই সঙ্গে অবৈধ মজুত ও কৃত্রিম সংকট তৈরির বিষয়েও সরকারের নজর রয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে বলেও জানান সচিব।
এদিকে দেশের সব দোকানপাট, বাণিজ্যবিতান ও শপিংমল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ দোকান মালিক ব্যবসায়ী সমিতি। জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দোকান মালিকরা। বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ দোকান মালিক ব্যবসায়ী সমিতি। সংগঠনের সভাপতি নাজমুল হাসান মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়।
রাত ৮টায় দোকান বন্ধ নিয়ে মালিকদের পাল্টাপাল্টি মত
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে রাত ৮টার মধ্যে দোকান ও শপিংমল বন্ধ নিয়ে পাল্টাপাল্টি মত দিয়েছেন দোকান মালিকরা। এক পক্ষ বলছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে রাত ৮টার পর সারাদেশে সব দোকান বন্ধ থাকবে। আরেক পক্ষ জানিয়েছে, এমন কোনো সিদ্ধান্তই নেননি দোকান মালিকরা।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে রাজধানীসহ সারাদেশে সব ধরনের দোকানপাট, বিপণিবিতান ও শপিংমল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার পক্ষে বিজ্ঞপ্তিতে সই করেন সংগঠনটির সভাপতি নাজমুল হাসান মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান টিপু।
তবে দোকান মালিকদের মূল সংগঠন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। বেশ কয়েক বছর ধরে এর সভাপতি হেলাল উদ্দিন। দোকান বন্ধের খবর ছড়িয়ে পড়লে তিনি গণমাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তা পাঠান। এতে তিনি বলেন, রাত ৮টার মধ্যে দোকান ও শপিংমল বন্ধের যে খবর ছড়িয়েছে, তা সঠিক নয়। আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি এখনও এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
হেলাল উদ্দিন বলেন, আগামীকাল শনিবার দুপুরে ১টায় জ্বালানিমন্ত্রী দোকান মালিকদের নিয়ে একটি সভা ডেকেছেন। সভায় উপস্থিত থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী। তাদের উপস্থিতিতে সভায় যোগ দিতে এরই মধ্যে সারাদেশের জেলা সমিতিগুলোর প্রতিনিধিরা ঢাকায় আসছেন। ওই দিন এ ব্যাপারে আলোচনা করা হবে।
মন্তব্য করুন