আরসিটিভি ডেস্ক 

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের প্রকোপ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১২ দিনে হাসপাতালটিতে হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ৫ জন শিশুর মৃত্যু হলো।
আজ রোববার দুপুর ২টা পর্যন্ত হাসপাতালটির বিশেষায়িত ইউনিটে ৬৬ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। হঠাৎ করে শিশুদের মধ্যে এই ছোঁয়াচে রোগের বিস্তার বেড়ে যাওয়ায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবক ও স্বজনরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শনিবার রাত ১১টার দিকে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার ছয় মাস বয়সি শিশু নুরুন্নবী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।
এর আগে, বিকেলে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরগোবদিয়া গ্রামের ৭ মাস বয়সি শিশু লিয়ন মৃত্যুবরণ করে। লিয়নের বাবা আবদুর রহিম জানান, তার একমাত্র সন্তান প্রথমে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিল। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর শরীরে হামের লক্ষণ দেখা দিলে পুনরায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।
জামালপুর থেকে আসা দেড় বছরের শিশু তাবাসসুমা আক্তারও এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার মা আফরোজা আক্তার উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলেন, দুই দিন আগে মেয়ের শরীরে হঠাৎ কড়া জ্বর আর লাল লাল দানা দেখে ভয় পেয়ে যাই। জামালপুরে ডাক্তার দেখানোর পর তারা দ্রুত এখানে নিয়ে আসতে বললেন। বড় হাসপাতালে এসেও শান্তি পাচ্ছি না, চারদিকে এত রোগী দেখে খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে। মেয়েটা কিছু খেতে পারছে না, সারাক্ষণ কান্নাকাটি করছে। শুধু দোয়া করছি যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারি।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন খান সমকালকে জানান, চলতি মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে হাসপাতালে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বাড়তে শুরু করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ২৪ মার্চ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তিনটি পৃথক মেডিকেল দল গঠন করে এবং শিশু ওয়ার্ডের তিনটি কক্ষে ১০ শয্যাবিশিষ্ট ‘হাম কর্নার’ চালু করে। তবে রোগীর চাপ বাড়ায় এই কক্ষগুলোতেও এখন স্থান সংকুলান হচ্ছে না।
তিনি আরও জানান, গত ১৭ মার্চ থেকে আজ রোববার পর্যন্ত মোট ১০৬ জন শিশু হাম নিয়ে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ মার্চ গৌরীপুরের ওয়াজকুরুনী (৪ মাস), ২৬ মার্চ ময়মনসিংহ নগরের তনুসা (৩ বছর) ও সামিয়া (২ বছর) নামে তিন শিশুর মৃত্যু হয়। সর্বশেষ দুই শিশুর মৃত্যুতে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫-এ।
হাসপাতালটির হাম কর্নারের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় এটি হাঁচি-কাশি বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক শিশু হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং চোখ ও মাথায় প্রদাহের মতো জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে আসছে, যা তাদের জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এমনকি যেসব শিশু নিয়মিত টিকা নিয়েছে, তাদের মধ্যেও এই রোগের সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আক্তারুজ্জামান জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করছেন। শিশুদের টিকাদানে কোনো সমস্যা বা গ্যাপ থাকার কারণে এই প্রাদুর্ভাব কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম বলেন, আগে এ ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়নি। সাধারণ রোগীদের সুরক্ষা দিতে আমরা পৃথক কর্নার চালু করেছি এবং প্রয়োজনে আইসোলেশন ওয়ার্ডের পরিধি আরও বাড়ানো হবে। বর্তমানে ময়মনসিংহ ছাড়াও পার্শ্ববর্তী নেত্রকোনা, শেরপুর ও জামালপুর জেলা থেকে আসা বিপুলসংখ্যক শিশুর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
মন্তব্য করুন