আরসিটিভি ডেস্ক 

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতে অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমাবর্ষণের জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের ২৭ মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন এলাকায় সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং হামলার জেরে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যার ফলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বাজারে ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এলএনজি ও তেল আমদানিতে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
সংঘাত শুরুর আগে গত শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি যেখানে ব্যারেলপ্রতি দাম ছিল ৬১ ডলার, তা বেড়ে বর্তমানে ৭২.৮৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৫ থেকে ১১০ ডলারে পৌঁছার শঙ্কা রয়েছে।
মার্কিন জ্বালানি তথ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন বিশ্বে ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ১৮ থেকে ১৯ মিলিয়ন ব্যারেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ তরল প্রাকৃতিক গ্যাসও এই পথ দিয়ে যায়। ফলে এই রুটে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যকে টালমাটাল করে দিতে পারে।
এদিকে দেশের জ্বালানিখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, আমাদের চাহিদার বেশিরভাগ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। আমদানিনির্ভর এসব পণ্যের বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশ কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান থেকে। বিশেষ করে দেশে এলএনজি ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের একক সরবরাহ উৎস কাতার, সৌদি আরব ও আরব আমিরাত।
চলমান সংঘাত তীব্র হলে তা বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক খাতে বড় সংকট তৈরি করতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশগুলোয় যদি যুদ্ধ অব্যাহত থাকে, তাহলে তেলের দাম বেড়ে যাবে এমনটাই মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম।
গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘এ ঘটনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহও ব্যাহত হতে পারে। আর তা দেশে গুরুতর গ্যাস সংকট সৃষ্টি করতে পারে।’
তবে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়লেও আগামী জুন পর্যন্ত দেশের জ্বালানি আমদানিতে তাৎক্ষণিক শঙ্কা দেখছে না বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সরকার টু সরকার চুক্তি ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির চুক্তি সম্পন্ন রয়েছে।
তবে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক দামের ঊর্ধ্বগতি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ– এই তিনটি ঝুঁকি বড় হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রয়েছে বলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে।
বিপিসির তথ্য বলছে, অপরিশোধিত তেল আসছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। অতীতে এসব চালান মূলত হরমুজ প্রণালি হয়ে এলেও এখন বিকল্প সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে ফুজাইরাহ টার্মিনাল ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। বছরে বিকল্প রুটে আনার প্রস্তুতি রয়েছে ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল।
জানা গেছে, বিপিসির কাছে কৌশলগত মজুত রয়েছে ৩০ দিনের জ্বালানি। প্রতি মাসে গড়ে ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে জ্বালানি আমদানি ও পরিশোধন করা হয়। আমদানি প্রিমিয়াম আগেই নির্ধারিত থাকায় তাৎক্ষণিক মূল্যবৃদ্ধির পুরো চাপ পড়ছে না। তবে স্পট মার্কেটে দাম বাড়লে ভবিষ্যতের চালানে ব্যয় বাড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘ হলে জাহাজ চলাচলে বীমা ব্যয় বাড়বে, পরিবহন সময় দীর্ঘ হবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এতে ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
জ্বালানি তেলের আপাতত সংকট না হলেও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
কারণ হিসেবে তারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আনা এলএনজির প্রায় পুরোটাই আসছে হরমুজ প্রণালি হয়ে। ইরান সংকট দীর্ঘায়িত হলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়তে পারে আমদানি ব্যয়, যা সরাসরি বিদ্যুৎ ও শিল্পকারখানার উৎপাদনকে প্রভাবিত করবে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলামের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে কাতার থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ হলে তা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি কোনদিকে যাচ্ছে আমরা সার্বক্ষণিক তার ওপর নজর রাখছি। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও বিষয়টি নজরে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
মন্তব্য করুন