আরসিটিভি ডেস্ক 

আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ঢাকা-গাইবান্ধা রুটে বিশেষ ট্রেন চালুর দাবি জানিয়েছে গাইবান্ধাবাসী। সীমিত আসন, বাড়তি যাত্রীর চাপ, টিকিট সংকট ও নিরাপদ যাতায়াতের অভাবে প্রতি বছরই দুর্ভোগে পড়ে এ জেলার লাখো মানুষ। সচেতন মহল ও যাত্রীদের অভিযোগ, গাইবান্ধার ওপর দিয়ে একাধিক আন্তনগর ট্রেন চলাচল করলেও জেলার জন্য বরাদ্দকৃত আসন সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। আসন্ন ঈদুল ফিতরে ঢাকা থেকে গাইবান্ধা-রংপুর-লালমনিরহাট রুটে বিশেষ ট্রেন চালুর দাবি তাদের।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ঢাকা-গাইবান্ধা রুটে তিনটি আন্তনগর ট্রেন নিয়মিত চলাচল করছে। তবে বামনডাঙ্গা, গাইবান্ধা ও বোনারপাড়া— এই তিন স্টেশনের জন্য মোট বরাদ্দ আসন সংখ্যা মাত্র ৪১২টি। অথচ জেলার সাত উপজেলা ও শহর মিলিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ ঢাকায় যাতায়াত করেন। বিশেষ করে দারিদ্র্যপ্রবণ এই জেলার বিপুল সংখ্যক নারী-পুরুষ জীবিকার তাগিদে ঢাকায় অবস্থান করেন। ঈদে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটাতে বাড়ি ফেরার সময় ট্রেনে সিট না পেয়ে অনেকেই বাধ্য হন ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে যাতায়াত করতে। এতে প্রতি বছরই সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।
বাড়েনি আসন, বেড়েছে যাত্রী
২০০৪ সালের ৭ মার্চ চালু হওয়া লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেনে ১৪টি বগিতে মোট ৫৯৩টি আসন থাকলেও গাইবান্ধার তিন স্টেশনের জন্য বরাদ্দ মাত্র ১৬৬টি। ২০১১ সালের ২১ আগস্ট চালু হওয়া রংপুর এক্সপ্রেসে মোট ৮৪০টি আসনের বিপরীতে বরাদ্দ ১৪১টি। আর ২০২৪ সালের ১২ মার্চ চালু হওয়া বুড়িমারী এক্সপ্রেসে মোট ৬৫৩টি আসনের মধ্যে গাইবান্ধা ও বোনারপাড়া স্টেশনের জন্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ১০৫টি আসন।
তবে বুড়িমারী এক্সপ্রেস ট্রেনটি বামনডাঙ্গা স্টেশনে তিন মিনিট বিরতি দিলেও সেখানে কোনো আসন বরাদ্দ নেই। ফলে ওই এলাকার যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
ঈদে বাড়ে কয়েকগুণ যাত্রীর চাপ
প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ৩০০টি বাস ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলাচল করে। সেই তুলনায় ট্রেনের আসন সংখ্যা খুবই কম বলে মনে করছে সচেতন মহল। তাদের মতে, ঈদের সময় যাত্রীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, টিকিট সংকট, কালোবাজারি, সিডিউল বিপর্যয় ও সেবার মানহীনতার কারণে অনেক যাত্রী ট্রেন এড়িয়ে সড়কে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা করতে বাধ্য হন। এতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত।
অন্য রুটে বিশেষ ট্রেন, বঞ্চিত গাইবান্ধা-রংপুর-লালমনিরহাট
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন রুটে পাঁচ জোড়া বিশেষ আন্তনগর ট্রেন চালুর ঘোষণা দেওয়া হলেও তার আওতায় পড়েনি গাইবান্ধা-রংপুর-লালমনিরহাট রুট। এ নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যাত্রীসংখ্যা ও বাস্তব চাহিদা বিবেচনায় উত্তরাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ রুট কেন উপেক্ষিত থাকছে।
ঢাকায় কর্মরত ট্রেনের যাত্রী রাসেল আহমেদ বলেন, নিরাপদ যাতায়াতের জন্য ট্রেনই আমাদের ভরসা। কিন্তু সিট পাওয়া যায় না। ঈদে পরিবার নিয়ে বাড়ি যেতে ভীষণ কষ্ট হয়। গাইবান্ধা রুটেও বিশেষ ট্রেন চালু করা উচিত।
পরিবেশ ক্লাবের গাইবান্ধা জেলার আহ্বায়ক গোলাম রব্বানী মুসা বলেন, রেলসেবায় গাইবান্ধার মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। এই রুটে যাত্রীসংখ্যা বাড়লেও আসন ও ট্রেন বাড়েনি। পর্যাপ্ত ট্রেন না থাকায় ঈদে বহু মানুষ ট্রাক, কাভার্ডভ্যান বা অন্য ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে বাড়ি ফেরেন। এতে প্রতিবছর দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।
বামনডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার হাইয়্যুল ইসলাম বলেন, বুড়িমারী এক্সপ্রেস ট্রেনটি এখানে থামে, কিন্তু কোনো আসন বরাদ্দ নেই। এখানে যাত্রীদের টিকিটের চাহিদা অনেক বেশি, কিন্তু সরবরাহ সীমিত।
গাইবান্ধা রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার সুমিত সরকার জানান, অনলাইনে শতভাগ টিকিট বিক্রির ফলে অন্য জেলার যাত্রীরাও এখানকার টিকিট কেটে নেন। এতে স্থানীয়দের জন্য সংকট আরও বাড়ে। তিনি বলেন, চাহিদার তুলনায় এই রুটে আরও কয়েকটি ট্রেন চালু করা জরুরি।
গাইবান্ধা-২ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আব্দুল করিম বলেন, গাইবান্ধাবাসীর নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে এই রুটে বিশেষ ট্রেন বরাদ্দ দেওয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। একই সাথে ঢাকায় যোগাযোগ করে বিষয়টি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হবে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের (রাজশাহী) জেনারেল ম্যানেজার ফরিদ আহমেদ বলেন, ঢাকা থেকে সান্তাহার হয়ে বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর ও লালমনিরহাট রুটে যাত্রীচাপ অনেক বেশি। কোচ ও মিটারগেজ ইঞ্জিন সংকট থাকায় আপাতত নতুন বা বিশেষ ট্রেন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সক্ষমতা বাড়লে ভবিষ্যতে এই রুটে নতুন ট্রেন দেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন