তথ্য প্রযুক্তি ডেস্ক 

অন্তর্বর্তী সরকার পর্যালোচনা ও জনমত গ্রহণের জন্য ‘বাংলাদেশ জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নীতিমালা (২০২৬-৩০)’ এর খসড়া প্রকাশ করেছে। সরকার বলছে, এই নীতিমালার মাধ্যমে দেশে একটি নিরাপদ, নৈতিক ও উদ্ভাবনবান্ধব এআই পরিবেশ গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি হবে। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করলে খসড়াটিতে বাস্তবায়ন, তদারকি ও নাগরিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে একাধিক ঘাটতির কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এআইয়ের ব্যবহার ব্যাপক কিন্তু খসড়ায় মাত্র কয়েকটি আইন নিয়ে কথা বলা হয়েছে।
সরকারের শেষ সময়ে এসে এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরাও। তাদের ভাষ্য, এআই ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে জ্বালানি ও পরিবেশের ব্যবহারের ওপর নীতিমালায় সুস্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। এতে বাংলাদেশ কেবল এআই প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হিসেবে বিকশিত হবে। কখনও উদ্ভাবক হবে এমন দিক নির্দেশনা অনুপস্থিত।
খসড়া নীতিমালায় মানবাধিকার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে এআই ব্যবহারের মূলনীতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এআই সিস্টেমের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ‘অ্যালগরিদমিক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’, সোশ্যাল স্কোরিং ও গণনজরদারির মতো ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা এবং ডিপফেক ও এআই-সৃষ্ট অপতথ্য মোকাবিলার অঙ্গীকার রয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ও জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে এই নীতিমালা দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের পথ তৈরি করবে।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এআই নীতিমালা বা কানাডার এআই নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের নীতিটি এখনও মূলত একটি নীতিগত ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। খসড়াটি আইন নয়, ফলে এর বিধান লঙ্ঘনে কী ধরনের শাস্তি বা প্রতিকার থাকবে, তা স্পষ্ট নয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলছেন, আইনগত বাধ্যবাধকতা ছাড়া ‘অ্যালগরিদমিক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ বা ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করা কঠিন হবে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠেছে স্বাধীন তদারকি ঘিরে। খসড়ায় এআই ব্যবহারের ওপর নজরদারির কথা বলা হলেও কে এই তদারকি করবে বা অভিযোগ নিষ্পত্তির দায়িত্ব কার, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে যেখানে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন এআই রেগুলেটর রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত কাঠামো কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করছেন অনেকে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও খসড়াটি তুলনামূলক সতর্ক ভাষা ব্যবহার করেছে। সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার কথা বলা হলেও ‘রিয়েল-টাইম ফেসিয়াল রিকগনিশন বা প্রেডিক্টিভ পুলিশিংয়ের’ মতো নজরদারিমূলক প্রযুক্তিতে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নেই। মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, এতে ভবিষ্যতে নাগরিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি থেকে যেতে পারে।
ডিপফেক ও এআই-সৃষ্ট অপতথ্য মোকাবিলায় গুরুত্ব দেওয়া হলেও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত ‘কনটেন্ট ওয়াটারমার্কিং’ বা প্ল্যাটফর্ম দায়বদ্ধতার মতো প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার বিস্তারিত দিকনির্দেশনা খসড়ায় অনুপস্থিত। একইভাবে ওপেন ডেটা ও ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে, সে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই খসড়া চূড়ান্ত দলিল নয়; জনগণ, শিল্পখাত ও শিক্ষাবিদদের মতামতের ভিত্তিতে এটিকে আরও শক্ত ও বাস্তবমুখী করা হবে। সরকারের মতে, এই নীতিমালা এআই ব্যবহারের মাধ্যমে জনসেবা আধুনিকায়ন, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। নীতিমালা বাস্তবায়নে একটি ‘স্বাধীন তদারকি কমিটি’ এবং ‘এআই প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন সেল’ গঠন করা হবে। এছাড়া দেশীয় উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে ২০২৬-৩০ সালের মধ্যে প্রায় ২০০-২৫০ কোটি টাকার একটি ‘এআই ইনোভেশন ফান্ড’ গঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৮ সালে এই নীতিমালার একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করা হবে এবং একই সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে শক্তিশালী ‘এআই আইন’ প্রণয়নের।
এ প্রসঙ্গে মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়ার আইন ও উদীয়মান প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ এরশাদুল করিম বলেন, ‘খসড়ায় এ আইয়ের কোনো সংজ্ঞা নেই। এটিতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের রূপরেখা নেই। এই নীতিমালায় বিদ্যমান অন্যান্য নীতিমালা বা আইনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি। তাই নীতিমালা তৈরিতে তাড়াহুড়ো না করে মন্ত্রণালয়গুলো থেকে শুরু করে খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, বেসরকারি খাতসহ সব পর্যায়ের অংশীদারদের অংশগ্রহণ জরুরি। সবার অংশগ্রহণে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি যেন এই নীতিমালা চূড়ান্ত করে। কারণ, এটি নিয়ে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ নেই।’
মন্তব্য করুন