আরসিটিভি ডেস্ক 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজে অনার্স থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত ফাইনাল পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সরকারি কলেজগুলোতে গত পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে অনার্স থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের একটি গোপন নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকার তথ্য অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও গোপন কৌশলে পরিচালিত এই চক্র পরীক্ষার তিন থেকে চার দিন আগেই অর্থের বিনিময়ে প্রশ্ন সরবরাহ করে আসছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, প্রতিটি কলেজে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী এই প্রশ্ন বাণিজ্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর সরকারি কলেজগুলোতে বিশেষ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষ থেকে মাস্টার্স ফাইনাল পর্যন্ত পরীক্ষার প্রশ্ন নিয়মিতভাবে ফাঁস হয়ে আসছে। পরীক্ষার আগে সরবরাহ করা প্রশ্নের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতি সেট দেড় হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। একেকটি কলেজের একটি সেশন থেকেই আদায় করা হয় প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানান, প্রশ্ন নেওয়ার আগে তাদের বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থে শপথ করানো হয়, যাতে বিষয়টি বাইরে প্রকাশ না পায়। শুরুতে বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করা হলেও পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় সবার কাছেই একই প্রশ্ন রয়েছে। পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সব প্রশ্ন কমন পড়েছে—এমন আলোচনা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
আরেক শিক্ষার্থী বলেন, পরীক্ষার তিন থেকে চার দিন আগেই সম্পূর্ণ প্রশ্ন সেট হাতে তুলে দেওয়া হতো। কেউ দেড় হাজার, কেউ আবার দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত দিয়েছে। পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলোর সঙ্গে আগেই পাওয়া প্রশ্নের হুবহু মিল ছিল।
তথ্য অনুসন্ধানে অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে ঢাকা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অফিস সহকারী ও সাবেক শিক্ষার্থী ইলিয়াস হোসেনের নাম। তাঁর সঙ্গে বিভাগের কয়েকজন বর্তমান শিক্ষার্থীও জড়িত বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই মূলত বেশি টাকা আদায় করা হয়। একটি নতুন ব্যাচ থেকেই প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা নেওয়ার তথ্য মিলেছে।
পরীক্ষার হলে আগাম প্রশ্ন ফাঁসের সরাসরি প্রমাণও পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অনার্স চতুর্থ ও দ্বিতীয় বর্ষ রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ফাইনাল পরীক্ষার সময় দুই শিক্ষার্থী বলেন, প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি আগেই জানা ছিল। পরে তাঁদের মোবাইলে থাকা প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র মিলিয়ে হুবহু মিল পাওয়া যায়। একই ধরনের অভিযোগ অনার্স প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষাগুলোতেও পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষার্থী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি অসাধু চক্র সিনিয়রদের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস করছে। এতে মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং পুরো পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে ইলিয়াস হোসেন বলেন, তিনি টানা পাঁচ বছর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে যুক্ত ছিলেন না, মাঝখানে দুই বছর তিনি বিভাগে কাজ করেননি।
তিনি আরও বলেন, প্রশ্ন কমন পড়ার বিষয়টি সিলেবাস ও পূর্ববর্তী বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণের ফল। টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তিনি কারও কাছ থেকে টাকা নেননি।
ঢাকা কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মো. আবু সালেক খান বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাত কলেজের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিমাদ্রি শেখর চক্রবর্তী জানান, প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পেলে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। এরপর তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসক অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি আগে কিছু শোনেননি। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন