নীলফামারী প্রতিনিধি 

নারীর মর্যাদা রক্ষায় সরকারি-বেসরকারিভাবে ঘটা করে বিভিন্ন দিবস, সভা-সেমিনার করা হলেও মাঠ পর্যায়ে নেই তার কোন প্রতিফলন। কর্মক্ষেত্রে নারীদের বেতন বৈষম্য দূরীকরণে নেই কোন পদক্ষেপ। উত্তরের জেলা নীলফামারীতে বিভিন্ন কোম্পনিতে কাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা কাজ করলেও রয়েছে মজুরি বৈষম্য।
নীলফামারী, ডোমার, কিশোরগঞ্জ, সৈয়দপুরসহ বিভিন্ন এলাকার নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে। তাঁরা জানান, সব জায়গাতেই নারীদের পারিশ্রমিক পুরুষদের তুলনায় অর্ধেক।
জেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, শত শত নারী-পুরুষ ফসলের পরিচর্যা, তামাকের মিলে কাজ, ধানের চারা রোপণ, মাটি কাটা, সড়ক সংস্কার, আলু উত্তোলনসহ নানা কাজ করছেন। এতে নারীরা পুরুষের সঙ্গে সমানতালে শ্রম দিলেও মজুরি পাচ্ছেন না সমান। পুরুষেরা দিন শেষে পেয়ে থাকেন ৫০০ টাকা আর নারীরা ২৫০ টাকা। কেউ কেউ ২০০ টাকাও পান বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফাগুনের আগুনঝরা রোদে রামগঞ্জ বাজারে সামছুল তামাক ক্রাশিং মিলে কাজ করতে আসা (ছদ্মনাম) রুপম, মেরিনা, ফেলানী, তহমিনা, বিলকিস কাজ করছেন। এ সময় রুপম জানান, আমি ৩০ বছর থেকে কাজ করছি, আমাদের নারী শ্রমিকদের দেখার কেউ নাই। এখানে ‘সকাল আটটায় কাজে যোগ দিয়েছি। বাড়ির পথে রওনা হব বিকেল চারটার পরে। প্রতিদিন এভাবেই চলে। আমার বেতন ২২০ আর ’তাগোর বেতন ৫০০।’
গজেন নামে তামাকের কাজ করতে আসা পুরুষ শ্রমিক বলেন, এখানে সকাল আটটায় আসি আর সন্ধা পাঁচটায় চলে যাই। ২০০ থেকে ৪০০ টাকা মধ্যে সিমাবদ্ধ। এ থেকে বেতন বারে না। কি করবো কাজ করে খেতে হবে। বাসায় বসে থাকলে তো এটাকাও পাবো না।
অভিজাত গ্রুপ অব কোম্পানিতে নাম নাপ্রকাশে অনেক নারী শ্রমিক বলেন, প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত কাজ করে মজুরি পাই ২০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা। এ দিয়ে সন্তানের লেখাপড়া আর সংসার চালাতে খুবই কষ্ট হয়। আমরা যদি পুরুষের সমান মজুরি পাই তাহলে আমাদের জন্য ভালো হতো। কিন্তু মালিককে বললে তারা বিষয়টি গুরুত্ব দেন না।’
ডোমার চিকনমাটি রোডে তামাকের মিলে শ্রমিকের কাজ করেন রাবেয়া বেওয়া তিনি বলেন, ‘নারী-পুরুষ বেতনবৈষম্য বুঝি না। কাম করন নাগবো, খাওন নাগবো। বাঁচন নাগবো। এর বাইরের চিন্তা আমাগোর মাথায় আহে না।’
টেংগনমারী এলাকার মেরিনা বেগম বলেন, মাঠে সব ধরনের কাজ করি পুরুষেরা মজুরি বেশি পায়। আমরা পুরুষের তুলনায় বেশি সময় ধরে কাজ করি। কাজের মধ্যে পুরুষেরা বিশ্রামের বিরতি নিলেও আমরা তেমন বিশ্রাম নেই না। কিন্তু পুরুষ শ্রমিকরা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরি পেলে আমরা পাই ২০০ থেকে ২৫০ টাকা।
নুরবানু আক্তার নামে এক ইটভাটায় শ্রমিক বলেন,‘কাজের মধ্যে পুরুষরা তাও এদিক ওদিক যায়। আমরা মেয়েরা দুপুরের বিরতি ছাড়া পুরো সময়টাতেই কাজ করি। তারপরও ওদের মজুরি আমাদের চেয়ে বেশি। সাপ্তাহিক কোনও ছুটি নেই উল্লেখ করে শ্রমিক নুরবানু আক্তার বলেন, ‘ছুটিছাটা নেই। কাজে না এলে মজুরি নেই। বাজার, কেনাকাটা, থাকা, সব নিজেদের। বছরে ৫-৬ মাস এই কাজ চলে। কিছু সময় শরীরের অবস্থা এত নাজুক থাকে যে বাকি সময় অন্য কোনও কাজ করার ক্ষমতা থাকে না।’
ডোমার শালকী ব্রিকসের কাজ করতে আসা পুরুষ শ্রমিক ফরিদুল ইসলাম জানান, ভাটায় ফজরে আসি আর সন্ধায় ৫টায় চলে যাই সাড়াদিন কাজ করে মজুরী পাই ৫০০টাকা। আর একাই কাজে নারী শ্রমিকরা ২০০ থেকে ২৫০ টাকা করে পায়। এ টাকা দিয়ে সংসার চলে না তারপরও খুব কষ্টে চলতে হচ্ছে। মালিক যদি বেতন না বাড়ায় আমাদের কিছু করার নাই। বেশি কিছু বললে কাল থেকে আসা বন্ধ করে দিবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নীলফামারীর নারী নেত্রী আরিফা সুলতানা লাভলী বলেন, পুরুষশাসিত সমাজে তাল মিলিয়ে সমান কাজ করলেও নারীরা মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। অথচ প্রতিবছর শ্রমিক দিবস, নারী দিবস পালিত হয়। সকল কাজে নারী-পুরুষের সমঅধিকারের বলা হয়। কিন্তু ন্যায্য মজুরির বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।
এ বিষয়ে জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, সরকারি কাজ টিআর, কাবিখা, কর্মসৃজনসহ বিভিন্ন প্রকল্পে নারী পুরুষের সমান মজুরি দেওয়া হয়। বেসরকারি ও মালিকানাধীন কাজেও নারী পুরুষের সমান মজুরি বৈষম্য দূর করার চেষ্টা করছি।
মন্তব্য করুন