নাটোর প্রতিনিধি 

রমজান এলেই ব্যস্ততা বেড়ে যায় নাটোর জেলার গোয়ালদিঘী-কৃষ্ণপুর এলাকার ‘মুড়ির গ্রাম’-এ। রাতদিন জ্বলে চুলা, কড়াইতে ফুটতে থাকে বালি, আর তার ভেতরেই সোনালি রঙে ফুলে ওঠে হাতে ভাজা মুড়ি। রাসায়নিকমুক্ত ঐতিহ্যবাহী এই মুড়ির কদর এখন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ধানের দাম বৃদ্ধি, মেশিনে উৎপাদিত মুড়ির প্রতিযোগিতা ও মূলধন সংকটে কারিগরদের জীবনযাপন এখনো সাদামাটা।
প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই মুড়ি ভাজার চুলা
গোয়ালদিঘী-কৃষ্ণপুর গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই সারাবছর মুড়ি ভাজা হয়। তবে রমজান মাসে চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় দিনরাত চলে কর্মযজ্ঞ। গ্রামের মানুষের প্রধান আয়ের উৎস এই হাতেভাজা মুড়ি। সেই কারণেই এলাকাটি এখন সবার কাছে পরিচিত ‘মুড়ির গ্রাম’ নামে।
স্থানীয় মুড়ি উৎপাদনকারী রহিমা বেগম বলেন,
“রমজান আসলেই আমাদের ঘুম থাকে না। রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত মুড়ি ভাজতে হয়। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আগেই অর্ডার আসে।”
আরেক কারিগর আব্দুল জলিল জানান,
“আমাদের মুড়ি সম্পূর্ণ রাসায়নিকমুক্ত। ধান ভিজিয়ে সিদ্ধ করে রোদে শুকিয়ে, ভাঙ্গিয়ে চাল বানিয়ে তারপর ভাজা হয়। স্বাদে-গন্ধে আলাদা বলেই চাহিদা বেশি।”
ধান থেকে মুড়ি—এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া
মুড়ি তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ সময়সাপেক্ষ। যাদের নিজস্ব জমি আছে তারা আমন, বিনা-৭, হরি ধান, ২৯, ১৬ ও ৫২ জাতের ধান উৎপাদন করেন। জমি না থাকলে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ধান কিনে নিতে হয়। এরপর ধান পানিতে ভিজিয়ে সিদ্ধ করা হয়, রোদে শুকিয়ে ভাঙ্গিয়ে চাল তৈরি করা হয়। সেই চাল বিশেষ কৌশলে গরম বালির মধ্যে ভেজে তৈরি হয় মুড়ি।
ধান কেনা থেকে শুরু করে সিদ্ধ, শুকানো, ভাঙ্গানো, মুড়ি ভাজা ও বাজারজাতকরণ—সব মিলিয়ে প্রায় ২০০ পরিবারের অন্তত ১ হাজার মানুষ সরাসরি এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। নারীরা মুড়ি ভাজার কাজে অগ্রণী ভূমিকা রাখলেও বাজারজাতকরণে পুরুষেরাও সমানভাবে অংশ নেন।
প্রতিদিন ৮০-১০০ মণ মুড়ি যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়
রমজানে ইফতারের অন্যতম অনুষঙ্গ এই হাতেভাজা মুড়ি। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০ মণ মুড়ি দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে। নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের ডাল সড়ক এলাকায় গড়ে উঠেছে একাধিক মুড়ির আড়ৎ। এখান থেকে ঢাকা, রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী ও সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।
এক আড়ৎদার বলেন,
“রমজানে চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে যায়। প্রতিদিন ট্রাকভর্তি মুড়ি বাইরে পাঠাতে হয়। নাটোরের হাতেভাজা মুড়ির আলাদা একটা ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি হয়েছে।”
সংকটও কম নয়
চাহিদা ও সুনাম থাকলেও সমস্যার শেষ নেই। ধানের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি মেশিনে তৈরি সস্তা মুড়ি বাজারে আসায় প্রতিযোগিতায় পড়তে হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী কারিগরদের। মূলধনের অভাবে অনেকেই বড় পরিসরে উৎপাদন বাড়াতে পারছেন না।
মুড়ি উৎপাদনকারী আব্দুস সামাদ বলেন,
“আমরা যদি স্বল্প সুদে ঋণ পেতাম, তাহলে বড় আকারে ব্যবসা করতে পারতাম। এখন অল্প পুঁজিতে কষ্ট করে চালাতে হচ্ছে।”
প্রশাসনের আশ্বাস
এ বিষয়ে নাটোর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ আদনান বলেন,
“মুড়ির গ্রাম আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। এখানকার হাতেভাজা মুড়ি দেশজুড়ে সুনাম অর্জন করেছে। উৎপাদনকারীদের সমস্যা নিরসনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে সরকারি প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।”
ঐতিহ্যের সাথে গ্রামীণ অর্থনীতির বন্ধন
ঐতিহ্য, পরিশ্রম আর পারিবারিক সম্পৃক্ততায় গড়ে ওঠা নাটোরের ‘মুড়ির গ্রাম’ এখন শুধু একটি গ্রামের নাম নয়—এটি গ্রামীণ অর্থনীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। যথাযথ প্রণোদনা, স্বল্প সুদের ঋণ ও আধুনিক বিপণন সুবিধা পেলে এই ক্ষুদ্র শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলে মনে করছেন ।
মন্তব্য করুন