আন্তর্জাতিক ডেস্ক 

বিশ্বের তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে জ্বালানির দাম আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এড হির্স।
তিনি বলেন, ‘যদি হরমুজ প্রণালীর অর্ধেক তেল প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়, সম্ভবত কারণ মার্কিন নৌবাহিনী আর ট্যাংকারগুলোকে নিরাপদে তীরে পৌঁছে দিতে পারছে না, তাহলে অন্তত কিছু সময়ের জন্য আমরা তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলারে ওঠার সম্ভাবনা দেখতে পারি।’
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, ‘এনএলজির বাজারে ইতোমধ্যেই এর প্রভাব দেখা গেছে, প্রথম দিনে দাম ৪০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম সোমবার থেকে মঙ্গলবারের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।’
এড হির্স আরো বলেন, ‘ডিজেলের দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। কিছু দেশ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এখন পেট্রোলিয়াম কিনতে শুরু করেছে, যা কিছু মার্কিন রাজ্যের ভবিষ্যত অর্ডারকেও প্রভাবিত করছে।’
তিনি যোগ করেন, ‘এ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইংল্যান্ড রাজ্যগুলোর জন্য অত্যন্ত প্রভাব ফেলবে। এমন হলে, এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য ঘরোয়া রাজনীতিতে খুবই খারাপ প্রভাব ফেলবে, বিশেষ করে আসন্ন মধ্যমেয়াদী নির্বাচনের আগে।’
বিশ্বের জ্বালানি বাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথটি বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রাণরেখা হিসেবে বিবেচিত। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে হরমুজ প্রণালি, যার এক পাশে ইরান, অন্য পাশে ওমান।
ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতার থেকে অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারগুলো এই সরু পথ দিয়েই চলাচল করে।
বিশ্বের মোট তেল, কনডেনসেট ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ৩০ শতাংশের বেশি এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। এ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা তেলের প্রায় ৮২ শতাংশ যায় এশিয়ায়, বাকি অংশ ইউরোপে। চীনের মোট এলএনজি আমদানির প্রায় ২৪ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়।
প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ৩০০টি জাহাজ এই পথে চলাচল করে; ব্যস্ত সময়ে কখনও কখনও প্রতি ছয় মিনিট পরপর জাহাজ চলতে দেখা যায়।
তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই হুমকি দিয়ে আসছিল, ইরান আক্রান্ত হলে এই নৌপথ বন্ধ করে দেওয়া হবে।
হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক বাজারে তেল সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়ে দাম হু হু করে বাড়বে এমন আশঙ্কা করা হচ্ছিল। তেল যেহেতু বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, তাই দামের যে কোনো উল্লম্ফন বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলবে। গত সপ্তাহে ইরানে হামলার পর হরমুজ প্রণালির কাছে তিনটি তেলবাহী জাহাজ হামলার শিকার হয়। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়।
এমন অবস্থার মধ্যে ৩ মার্চ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেয় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, এই পথ দিয়ে কোনো জাহাজ পার হওয়ার চেষ্টা করলে সেটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হবে।
আইআরজিসির কমান্ডার-ইন-চিফের একজন সিনিয়র উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাবারি বলেছেন, ‘প্রণালীটি বন্ধ। যদি কেউ অতিক্রম করার চেষ্টা করে, তাহলে বিপ্লবী গার্ড এবং নিয়মিত নৌবাহিনীর বীররা সেই জাহাজগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেবে।’
আইআরজিসির টেলিগ্রাম চ্যানেলে এক পোস্টে জাবারি আরো বলেন, ‘আমরা তেল পাইপলাইনগুলোতেও আক্রমণ করব এবং এক ফোঁটা তেলও এই অঞ্চল ছেড়ে যেতে দেব না। আগামী দিনে তেলের দাম ২০০ ডলারে পৌঁছাবে।’
মন্তব্য করুন