
মৌসুমের শুরুতে ভালো দামের আশায় সুপারি কিনে পানির নিচে সংরক্ষণ করেছিলেন লালমনিরহাটের কৃষকরা। কয়েক মাস পর বাজারে সেই সুপারি তুললেও প্রত্যাশিত দাম মিলছে না। গত বছরের তুলনায় এবার সংরক্ষিত ‘মজা সুপারির’ দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় উৎপাদন, সংরক্ষণ ও শ্রমিক খরচ তুলতে না পেরে লোকসানের শঙ্কায় পড়েছেন জেলার কৃষকরা।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ী ইউনিয়নের কৃষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার সুপারির দাম অনেক কম। প্রায় অর্ধেক দামে সুপারি বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে সুপারি সংরক্ষণ ও শ্রমিকের খরচই উঠছে না। উৎপাদিত সুপারি বাজারজাতকরণে কৃষকদের আরও কার্যকর সহায়তা প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।
শুধু জাহিদুল ইসলাম নন, জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরাও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। আদিতমারী, কালীগঞ্জ, সদর, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রামের বিভিন্ন বাজারে সংরক্ষিত সুপারি নিয়ে আসা কৃষকদের মধ্যে কম দাম নিয়ে হতাশা দেখা গেছে। কৃষকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন সুপারি সংরক্ষণ করে শেষ পর্যন্ত যদি উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয়ই না ওঠে, তাহলে এ পদ্ধতিতে সুপারি সংরক্ষণ করে লাভবান হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
বড়বাড়ী হাটে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর এই সময়ে দেশি মজা সুপারি প্রতি পোন (৮০টি) ৩০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এবার একই পরিমাণ সুপারি বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকায়। প্রতি কাউন (১৬ পোন) সুপারি গত বছর ৪ হাজার ৮০০ থেকে ৯ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার তা নেমে এসেছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ৫ হাজার ৬০০ টাকায়।
কৃষকদের মতে, উৎপাদনের পর সুপারি সংরক্ষণ করতে পানির নিচে রাখতে হয়। এ কাজে শ্রমিকের মজুরি, ওঠানো-নামানো, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে বাড়তি খরচ হয়। ফলে বাজারদর কমে গেলে শুধু বিক্রয়মূল্য কমে না, বরং সংরক্ষণে করা অতিরিক্ত বিনিয়োগও কৃষকের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
কৃষকরা বলছেন, সাধারণত মৌসুম শেষে সংরক্ষিত সুপারি বাজারে তুললে ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু এবার বাজারে একই সময়ে বিপুল পরিমাণ সংরক্ষিত সুপারি আসায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সরবরাহ বেশি থাকায় পাইকারদের কাছে দরকষাকষির সুযোগও কমে গেছে বলে জানান তাঁরা।
লালমনিরহাটের সুপারি বাজারে কৃষকদের পাশাপাশি সংরক্ষণকারী ব্যবসায়ীরাও সক্রিয়। ব্যবসায়ী মোস্তফা হোসেন বলেন, মৌসুমের শুরুতে কৃষকদের কাছ থেকে সুপারি কিনে পানির নিচে সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে যে দামে বিক্রি হচ্ছে, তাতে ক্রয়মূল্যই উঠছে না। পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয় যোগ হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা আরও বাড়ছে।
মহাজন ফজলুর রহমান বলেন, মৌসুমের শেষ দিকে সাধারণত সংরক্ষিত সুপারির চাহিদা বাড়ে। এবার বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় প্রত্যাশিত চাহিদা তৈরি হয়নি। ফলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা মজুত সুপারি দ্রুত বিক্রি করতে গিয়ে কম দাম পাচ্ছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাইখুল আরিফিন বলেন, লালমনিরহাটের গ্রামাঞ্চলের বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় ও নদীতীরবর্তী এলাকায় প্রচুর সুপারি গাছ রয়েছে। পাশাপাশি জেলায় ৫১৪ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে সুপারি চাষ হচ্ছে। উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজারের চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই মূলত সুপারির দাম নির্ধারিত হয়।
তবে কৃষকদের বাজারজাতকরণ ও বর্তমান দরপতন সম্পর্কে জেলা কৃষি বিপণন দপ্তরের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদ বলেন, মজা সুপারির বর্তমান বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
কৃষকদের দাবি, শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, উৎপাদিত সুপারি সংরক্ষণ ও ন্যায্যমূল্যে বাজারজাতকরণেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে মৌসুম শেষে বাজারে সরবরাহের চাপ কমানো, বিকল্প বাজার তৈরি এবং কৃষকদের বাজারদর সম্পর্কে আগাম তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে তাঁরা উপকৃত হবেন।
কৃষকরা বলছেন, সুপারি তাঁদের বাড়তি আয়ের অন্যতম উৎস হলেও দাম কমে গেলে সেই আয়ের হিসাব দ্রুত লোকসানে পরিণত হয়। বর্তমান দরপতন দীর্ঘায়িত হলে আগামী মৌসুমে সুপারি উৎপাদন ও সংরক্ষণে কৃষকদের আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
প্রকাশক: মোঃ শরিফুল ইসলাম। যোগাযোগ: মেডিকেল পূর্ব গেট, বুড়িরহাট রোড, রংপুর, বাংলাদেশ।
Copyright © 2026 RCTV ONLINE. All rights reserved.