যুদ্ধ, বৈষম্য ও সহিংসতার কোলাহলে যখন বিশ্ব ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে, তখন মানুষের প্রতি মানুষের আন্তরিকতা, আস্থা ও সহমর্মিতার প্রতীক হিসেবে বন্ধুত্বের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল সমাজ গঠনে বড় বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলন বা কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়ের আন্তরিক সম্পর্কও সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশ্বব্যাপী আজ ৩০ জুলাই পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস। বৈশ্বিক শান্তি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সংহতি এবং মানবিক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে জাতিসংঘ ঘোষিত এ দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা আয়োজনে উদযাপিত হচ্ছে।
দিবসটির মূল লক্ষ্য ব্যক্তি থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে বিশ্বপর্যায়ে সম্পর্কের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করা। বর্তমান বিশ্বে সংঘাত, বিভাজন ও বৈষম্যের নানা বাস্তবতায় বন্ধুত্বের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, বন্ধুত্ব কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা আড়ম্বরের বিষয় নয়। বরং মন খুলে কথা বলা, সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করা এবং একে অপরকে জীবনের সহযাত্রী হিসেবে গ্রহণ করার মধ্য দিয়েই প্রকৃত বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। আর এ ধরনের সম্পর্কই ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে পারস্পরিক আস্থা এবং সম্প্রীতির ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, বন্ধুত্ব এখন শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জাতি, ধর্ম, ভাষা ও ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে একটি সহনশীল, শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতিময় বিশ্ব গঠনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে মানুষের সঙ্গে মানুষের আন্তরিক সম্পর্ক। বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মের কাছেও বন্ধুত্ব শুধু একটি সামাজিক সম্পর্ক নয়, বরং পারস্পরিক সহযোগিতা, মানসিক শক্তি এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বন্ধুত্ব মানুষকে বৈচিত্র্যকে সম্মান করতে শেখায়, ভিন্ন মত ও সংস্কৃতিকে গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং কঠিন সময়ে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরি করে।
জাতিসংঘের বার্তায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবসের উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি, সংঘাত হ্রাস এবং ইতিবাচক সমাজ গঠনে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। একই সঙ্গে তরুণদের সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, মানবাধিকার সুরক্ষা, নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষা ও জ্ঞানের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংযুক্ত করলেও আন্তরিকতার ঘাটতি ও মানসিক দূরত্বের কারণে অনেক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ছে। এমন বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস মানুষকে হারিয়ে যেতে বসা আস্থা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নতুন করে জাগিয়ে তোলার আহ্বান জানায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দিবসটি উদযাপনে বড় কোনো আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন নেই। পুরোনো কোনো বন্ধুকে একটি ফোনকল করা, হাতে লেখা একটি চিঠি পাঠানো, সমাজসেবামূলক উদ্যোগে অংশ নেওয়া কিংবা নতুন কোনো মানুষের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার মতো ছোট ছোট উদ্যোগই ব্যক্তি ও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক যত বিস্তৃত হবে, ততই সামাজিক বিভাজন কমবে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়বে। ফলে ব্যক্তি থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে বৈশ্বিক পরিসরে শান্তি, সংহতি ও মানবিক সম্প্রীতির ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হবে।
আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস উপলক্ষে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ মানবিক বৈচিত্র্যকে উদযাপনের পাশাপাশি আরও শান্তিপূর্ণ, সম্প্রীতিময় ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছেন। শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ শুরু হতে পারে মানুষের প্রতি মানুষের আন্তরিকতা, বিশ্বাস ও বন্ধুত্ব থেকেই—এমন বার্তাই তুলে ধরছে এ বছরের আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস।
প্রকাশক: মোঃ শরিফুল ইসলাম। যোগাযোগ: মেডিকেল পূর্ব গেট, বুড়িরহাট রোড, রংপুর, বাংলাদেশ।
Copyright © 2026 RCTV ONLINE. All rights reserved.