পরিবেশ সুরক্ষায় জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আইন প্রয়োগে কঠোর অবস্থান নিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত গেল ৭ মাসে রংপুরে ২৪টি অভিযান চালিয়েছে সরকারি এই সংস্থাটি। এতে আদায় করেছে ২৪ লাখ ৭০০ টাকা জরিমানা। অবৈধ ইটভাটা, নিষিদ্ধ পলিথিন, শব্দ দূষণ, অবৈধ বর্জ্য টায়ার ও পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করে এ জরিমানা আদায় করে সংস্থাটি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত মাসে ১১টি অবৈধ ইটভাটায় অভিযান পরিচালনা করে ২১ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। পাশাপাশি চারটি ইটভাটার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এছাড়া ইটভাটার চিমনি ও কিলন ভেঙে সম্পূর্ণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।
একই সময়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের একটি অভিযানে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে অনুমোদিত মাত্রার অতিরিক্ত শব্দ ছড়ানো হর্ন ব্যবহারের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযান পরিচালনা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসব অভিযানে আরও ১০ হাজার ৭০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
সূত্র আরও জানিয়েছে, অবৈধ টায়ার পাইরোলাইসিস কারখানার বিরুদ্ধে দুটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে। এছাড়াও পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা উৎপাদনকারী একটি অবৈধ ভাট্টির বিরুদ্ধে পৃথক অভিযানে এক্সকাভেটরের সাহায্যে চুল্লিসহ প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
পরিবেশ সুরক্ষা আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এসময়ে চিকলি ওয়াটার পার্কে মাটি, পানি, বায়ু ও শব্দদূষণ রোধে এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার বন্ধে সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এছাড়া গত ১০ এপ্রিল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি এবং ২৯ এপ্রিল আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস উপলক্ষ্যে জনসচেতনতামূলক সভার আয়োজন করা হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তর আরও জানায়, অর্থদণ্ড দেওয়া এসব ইটভাটার অধিকাংশই বৈধ অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত হচ্ছিল অথবা পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন লঙ্ঘন করে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। অনেক ইটভাটায় আধুনিক প্রযুক্তির পরিবর্তে পুরোনো ও নিষিদ্ধ চুল্লি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা আশপাশের পরিবেশ, কৃষিজমি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। কোথাও কোথাও কৃষি জমি নষ্ট করে ভাটা স্থাপন, আবার কোথাও বসতবাড়ির খুব কাছেই ইটভাটা চালু রাখার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রংপুর জেলায় মোট ২৪০টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে দেড় শতাধিকে বেশি ইটভাটা অবৈধ। পরিবেশগত লাইসেন্স না থাকা এবং প্রয়োজনীয় শর্ত না মেনে অবৈধভাবে এসব ভাটায় ইট উৎপাদন করছে। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি মাটির উপরের অংশ তুলে নেওয়ায় জমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কিন্তু, জনবল সংকট ও নিজস্ব নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট না থাকায় চাহিদা অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করাসহ আইনের যথাযথ প্রয়োগ করা সম্ভব হয়ে উঠছে না বলেও জানিয়েছে সরকারি এই সংস্থাটির কর্মকর্তাগণ।
পরিবেশ অধিদপ্তর রংপুরের উপ-পরিচালক মো. আব্দুস সালাম সরকার বলেন, আমরা শুধু আইন প্রয়োগেই সীমাবদ্ধ নই, যারা আইন লঙ্ঘন করছে তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। পরিবেশ বিধ্বংসী কোনো ধরনের কর্মকাণ্ডকে ছাড় দেওয়া হবে না। তবে পরিবেশ সংরক্ষণ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, প্রতিটি নাগরিকেরও দায়িত্ব। জনগণের সহযোগিতা ছাড়া টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছপালা ও বনভূমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এজন্য পরিবেশ রক্ষায় সকলকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি বেশি বেশি বৃক্ষরোপণ করতে হবে। আমরা পরিবেশ অধিদপ্তরের সাথে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করে আসছি। কিন্তু শুধু অভিযান ও জরিমানা করে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য ও দূষণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। যার যার অবস্থান থেকে পরিবেশের সুরক্ষায় কাজ করতে সবার প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম বলেন, উন্নত দেশগুলোর শিল্পায়ন ও অতিরিক্ত গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ পরিবেশ দূষণের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি দায়ী। এর ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বিশ্বজুড়ে ক্রমেই বাড়ছে।
অবৈধ ইটভাটা বন্ধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি পরিবেশ ও কৃষির জন্য মারাত্মক হুমকি। কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে নেওয়ায় জমির উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। এজন্য অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে প্রশাসনকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রকাশক: মোঃ শরিফুল ইসলাম। যোগাযোগ: মেডিকেল পূর্ব গেট, বুড়িরহাট রোড, রংপুর, বাংলাদেশ।
Copyright © 2026 RCTV ONLINE. All rights reserved.