বিশ্বকাপ গ্রুপ পর্বের হিসাব-নিকাশ শেষ, এখন শুধু বেঁচে থাকার লড়াই—হারলেই ফিরতে বিমান ধরার জন্য ব্যাগ গোছাতে হবে। সোমবার হিউস্টন স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে ব্রাজিল ও জাপান—দুটি দেশ, দুটি মহাদেশ, দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ফুটবল দর্শন। একদিকে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন সেলেসাওর শিরোপা পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে জাপানের সামুরাই ব্লুদের ইতিহাস ভাঙার স্পর্ধা।
‘সি’ গ্রুপের শীর্ষ দল হিসেবে নকআউটে ওঠা ব্রাজিল মরক্কোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র দিয়ে শুরু করলেও পরে হাইতি ও স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে পরাজিত করেছে। প্রথমে গোল হজমের পর দলটি প্রতিপক্ষের জালে সাতবার বল পাঠিয়েছে। কার্লো আনচেলত্তির দল নিজেদের সেরা ছন্দ খুঁজে পাওয়ার পথে আছে। প্রতিপক্ষের জন্য এটা বিপদ সংকেত।
আক্রমণভাগে ব্রাজিলের সম্পদ রীতিমতো ঈর্ষণীয়। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র চার গোল করেছেন—গ্রুপ পর্বে কোনো ব্রাজিলিয়ানের এই কীর্তি শুধু রোনালদো (২০০২), নেইমার (২০১৪) ও জাইরজিনহো (১৯৭০) গড়েছিলেন। কুনহা মাত্র চার অন-টার্গেট শট থেকে তিন গোল করেছেন। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ১৯ বছর ৩২৫ দিন বয়সে রায়ান অ্যাসিস্ট করেছেন, ১৯৬৬ সালের পর থেকে কোনো ব্রাজিলিয়ানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপ অ্যাসিস্ট সেটা। এই তরুণ প্রজন্মের উপস্থিতি ব্রাজিলের আক্রমণকে শুধু শক্তিশালী নয়, অপ্রত্যাশিতও করে তুলেছে।
ইতিহাস ব্রাজিলের পক্ষে কথা বললেও সতর্কতার কারণ আছে। শেষ ছয় বিশ্বকাপ নকআউট ম্যাচের চারটিতে ব্রাজিল বিদায় নিয়েছে—আগের ১৭ নকআউট ম্যাচের তুলনায় এই অনুপাত অনেক বেশি। বিশেষত ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে তাদের বিদায় নেওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। আর ১৯৯০ সালের পর থেকে ব্রাজিল কখনো প্রথম নকআউট রাউন্ডেই বিদায় নেয়নি—ওই পর্যায় থেকে সর্বশেষ তাদের বিদায় করেছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়ানোর চাপ আনচেলত্তির মাথায় নিশ্চয়ই আছে।
জাপান এই ম্যাচে নামছে নিজেদের ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে। নেদারল্যান্ডস ও সুইডেনের সঙ্গে ড্র এবং তিউনিসিয়াকে ৪-০ গোলে হারিয়ে তারা ‘এফ’ গ্রুপ থেকে উঠে এসেছে। এই বিশ্বকাপে সাত গোল করেছে দলটি, যা জাপানের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ। দশজন খেলোয়াড় গোল বা অ্যাসিস্টে অবদান রেখেছেন—এটিও তাদের রেকর্ড। দলগত এই বৈচিত্র্য বলছে, ব্রাজিলকে শুধু এক বা দুজনকে নিয়ে পরিকল্পনা সাজালেই হবে না।
কৌশলগত দিক থেকে জাপান চমক দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আয়াসে উয়েদা এই আসরে জাপানি কোনো খেলোয়াড়ের মধ্যে যৌথভাবে সর্বোচ্চ তিনটি গোলে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাকেফুসা কুবো ফিটনেস নিয়ে সংশয়ে থাকলেও দলটির সামগ্রিক কাঠামো এতটাই সংগঠিত যে, একজনের অনুপস্থিতি পুরো পরিকল্পনাকে ভেঙে দেবে—এমন শঙ্কা নেই। অধিনায়ক ওয়াতারু এন্দো ও তারকা কাওরু মিতোমার আঘাতজনিত অনুপস্থিতির পর জাপান দশ ম্যাচে অপরাজিত।
দুই দেশের সম্পর্কের একটি মানবিক মাত্রাও আছে। বিশ্বের বৃহত্তম জাপানি প্রবাসী সম্প্রদায় বাস করে ব্রাজিলে। জিকো থেকে শুরু করে ব্রাজিলিয়ান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের জাপান জার্সি পরার ইতিহাস দুই দেশের ফুটবল সম্পর্ককে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। কিন্তু মাঠে সোমবার রাতে সেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা পাশে থাকবে, জায়গা ছাড়বে না। চোটের পর ৯৮১ দিন দলের বাইরে থাকা নেইমার ফিরেছেন। এই প্রত্যাবর্তন ব্রাজিলের মনোবল বাড়িয়েছে, যদিও তিনি কতটা সময় মাঠে থাকবেন তা নির্ভর করছে আনচেলত্তির বিবেচনায়।
অপটা সুপারকম্পিউটারের ২৫ হাজার সিমুলেশনে ব্রাজিলের ৯০ মিনিটের মধ্যে জয়ের সম্ভাবনা ৫৭.৩ শতাংশ, জাপানের সম্ভাবনা ১৯.৭ শতাংশ। অতিরিক্ত সময়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ২৩ শতাংশ। অতীত পরিসংখ্যানও ব্রাজিলের পক্ষে—দুই দলের ১৪ মোকাবিলায় জাপান মাত্র একবার জিতেছে। সেই জয় এসেছিল সর্বশেষ মোকাবিলায়, গত অক্টোবরে।
হিউস্টনের রাতে ব্রাজিলের সামনে আছে ইতিহাস বদলানোর দায়, জাপানের সামনে ইতিহাস তৈরির সুযোগ। পাঁচ তারার ভার বুকে নিয়ে সেলেসাও নামবে, আর সামুরাই ব্লুরা নামবে এশিয়ার ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অদম্য প্রতিজ্ঞায়।
প্রকাশক: মোঃ শরিফুল ইসলাম। যোগাযোগ: মেডিকেল পূর্ব গেট, বুড়িরহাট রোড, রংপুর, বাংলাদেশ।
Copyright © 2026 RCTV ONLINE. All rights reserved.