
নাটোর সদর উপজেলার লক্ষীপুর ওষুধি গ্রাম সংলগ্ন এলাকায় বাঘ সদৃশ একটি প্রাণীর দেখা পাওয়ার খবরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিডিওতে দেখা প্রাণীটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার নয়; এটি বড় আকৃতির শিয়াল বা শিয়ালজাতীয় কোনো বন্যপ্রাণী হতে পারে।
রোববার (২১ জুন) সন্ধ্যার আগে সদর উপজেলার ওষুধি গ্রামের আমিরগঞ্জ বাজার সংলগ্ন সড়কের পাশে একটি ভুট্টাক্ষেতের মধ্য দিয়ে প্রাণীটিকে হেঁটে যেতে দেখেন স্থানীয়রা। পরে শহিদুল্লাহ নামে এক যুবক দূর থেকে প্রাণীটির ভিডিও ধারণ করেন। ভিডিওটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ‘বাঘ’ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শী শহিদুল্লাহ বলেন,
“ওষুধি গ্রামের আমিরগঞ্জ বাজারের সড়কের পাশে ভুট্টাক্ষেতের মধ্যে দিয়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মতো দেখতে প্রাণীটিকে হেঁটে যেতে দেখি। পরে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করি। খবর ছড়িয়ে পড়লে এক থেকে দেড়শ মানুষ সেখানে জড়ো হয়। লোকজন ধাওয়া করলে প্রাণীটি ভুট্টাক্ষেতের মধ্যে ঢুকে পড়ে। এরপর আর তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।”
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুজ্জামান হোসেন বলেন,
“বাঘের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেই সন্ধ্যার পর বাইরে বের হচ্ছেন না। শিশুদেরও একা বাইরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। সবাই সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।”
এ বিষয়ে পরিবেশ কর্মী ও সাংবাদিক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন,
“ভিডিওটি নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের আলোচনা চলছে। তবে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া আতঙ্ক ছড়ানো ঠিক হবে না। বিষয়টি বন বিভাগের বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রাণীটি যদি সত্যিই কোনো বন্যপ্রাণী হয়ে থাকে, তাহলে তার নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।”
নাটোর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনসুর রহমান বলেন,
“বাঘ সদৃশ প্রাণী দেখার বিষয়টি আমরা শুনেছি। স্থানীয়দের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর একা চলাচল না করা এবং গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে রাখার জন্য বলা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রাণীটির কারণে কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা আক্রমণের ঘটনা ঘটেনি।”
নাটোর ফরেস্ট রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (এসএফএনটিসি) মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন,
“ভিডিওতে প্রাণীটিকে স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে এ অঞ্চলে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের স্বাভাবিক আবাসস্থল নেই। তাই এটি বাঘ হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এটি শিয়াল বা শিয়ালজাতীয় কোনো প্রাণী হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন,
“যদি প্রাণীটিকে আবার দেখা যায়, তাহলে কেউ যেন এটিকে বিরক্ত বা উত্যক্ত না করেন। বিষয়টি দ্রুত বন বিভাগকে জানাতে হবে। আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করব এবং প্রয়োজন হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও রাজশাহীর বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”
বন বিভাগের এই কর্মকর্তা জানান,
“বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ অনুযায়ী কোনো বন্যপ্রাণী শিকার, আঘাত বা উত্যক্ত করা দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই গুজব বা ভুল ধারণার ভিত্তিতে প্রাণীটির কোনো ক্ষতি না করার জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে।”
এদিকে রাজশাহী বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন্যপ্রাণী পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির বলেন,
“নাটোর একটি কৃষিনির্ভর জেলা এবং সুন্দরবন থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। এখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগার চলে আসার বাস্তবসম্মত কোনো সুযোগ নেই। ভিডিও দেখে এটি বড় আকৃতির শিয়াল বলেই মনে হয়েছে। বাঘ হলে সাধারণত মানুষের উপস্থিতিতে ভিন্ন আচরণ দেখা যেত। কিন্তু প্রাণীটি লোকজন দেখে পালিয়ে গেছে, যা শিয়ালজাতীয় প্রাণীর আচরণের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।”
তিনি আরও বলেন,
“তবুও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে খোঁজখবর নেওয়া হবে। প্রাণীটি আশপাশের জলাভূমি, ঝোপঝাড় বা ফসলি জমির আড়ালে অবস্থান করতে পারে। তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হবে যে এটি আসলে কোন প্রজাতির প্রাণী।”
স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক থাকলেও বন বিভাগ বলছে, বর্তমানে ভয় পাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। তবে প্রাণীটি পুনরায় দেখা গেলে দ্রুত বন বিভাগকে অবহিত করার পাশাপাশি জনসাধারণকে শান্ত ও সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
প্রকাশক: মোঃ শরিফুল ইসলাম। যোগাযোগ: মেডিকেল পূর্ব গেট, বুড়িরহাট রোড, রংপুর, বাংলাদেশ।
Copyright © 2026 RCTV ONLINE. All rights reserved.