‘বাবা’ শব্দটি যত সহজে উচ্চারণ করা যায়, সেই শব্দের মানুষটিকে বিশ্লেষণ করা ততটাই কঠিন। প্রায় প্রতিটি মানুষের কাছেই বাবা একজন সুপারহিরো। নিজের প্রতিটি পরিশ্রম, ত্যাগ ও সংগ্রাম তিনি উৎসর্গ করেন পরিবার, বিশেষ করে সন্তানের জন্য।
আজ বিশ্ব বাবা দিবস। বাবাকে ঘিরে অনেকেরই রয়েছে অসংখ্য স্মৃতি, আবেগ আর না বলা কথা। সেই অনুভূতির কিছু অংশ তুলে ধরেছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থীরা।
সন্তানের খুশিই যেন বাবার সবচেয়ে বড় অর্জন—এমনই এক স্মৃতিচারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী নোশিন তাবাসসুম পুষ্পিতা বলেন,
“বাবাকে নিয়ে আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত হলো যেদিন আমার (এসএসসি) পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। ২০১৯ সালে যখন আমার এসএসসি পরীক্ষা চলছিল, তখন বাবা চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন।
আমি যখন নবম শ্রেণিতে পড়ি, তখন বাবার ‘রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস’ ধরা পড়ে। দেশে এমন কোনো চিকিৎসক ছিলেন না, যার কাছে বাবা যাননি। কিন্তু সবাই একই কথা বলতেন—এই রোগ পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য নয়, কেবল নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
খবরটি শোনার পর বাবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। প্রতিদিন তার সারা শরীরে অসহনীয় ব্যথা হতো। সেই সময় আমি সারারাত এক হাতে বই পড়তাম, আর অন্য হাতে বাবার শরীরে মালিশ করতাম।
পরীক্ষার সময় বাবা ভারতে থাকায় আমি খুব চিন্তিত ছিলাম। বিশেষ করে জীববিজ্ঞান পরীক্ষার দিনও ভাবছিলাম, তিনি একা সব সামলাতে পারছেন কি না। আলহামদুলিল্লাহ, চিকিৎসা শেষে বাবা সুস্থভাবে বাড়ি ফিরেছিলেন।
অসুস্থ অবস্থায় বাবা আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি যদি বেশিদিন বেঁচে না-ও থাকি, আমার খুব ইচ্ছা তোমাকে একটি অসাধারণ ফলাফল করতে দেখব। তুমি চেষ্টা করো, যেন আমি আনন্দ নিয়ে মরতে পারি।’
ফল প্রকাশের দিন সকাল থেকেই সবাই খুব উদ্বিগ্ন ছিলাম। যখন খুদে বার্তায় (এসএমএস) দেখলাম আমি ‘গোল্ডেন জিপিএ-৫’ পেয়েছি, তখন বাবাকে ফোনে খবরটি জানাই। বাবা তখন বাইরে ছিলেন। খবর শুনেই তিনি দৌড়ে বাড়ি এসে আমাকে জড়িয়ে ধরেন। বাবা-মা দুজনই অনেকক্ষণ কেঁদেছিলেন।
পরে এলাকার মানুষের কাছ থেকে শুনেছি, বাবা এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে শরীরের ব্যথাও ভুলে গিয়েছিলেন। সেদিন তিনি পুরো এলাকায় এবং আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করেছিলেন। জীবনে বাবাকে আমি এত খুশি আর কখনও দেখিনি।”
অন্যদিকে, বাবাকে হারানো গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী ইমান হোসেন ইমন বলেন,
“আজ নাকি বাবা দিবস! সবাই তাদের বাবাকে নিয়ে ভালোবাসার কথা লিখছে, ছবি দিচ্ছে। আর আমি শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি।
আমার বাবাও ছিলেন—আমার সবচেয়ে বড় ভরসা, আমার সাহস।
আজ তিনি নেই, তবুও প্রতিটি দিনেই তার অভাব অনুভব করি। কোনো সমস্যা এলে এখনও মনে হয়—‘বাবা থাকলে হয়তো সব ঠিক হয়ে যেত।’
বাবা, তুমি কি জানো? তোমার শেখানো ছোট ছোট কথাগুলোই আজ আমাকে শক্ত রাখে। তোমার না থাকাটাই আমাকে বড় করে দিয়েছে, কিন্তু ভেতরে আমি এখনও তোমার ছোট্ট সন্তান হয়েই রয়ে গেছি।
আজ বাবা দিবসে তোমাকে কিছু দেওয়ার নেই, শুধু একটি দোয়া—আল্লাহ তোমাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। ভালোবাসি বাবা। এই ভালোবাসা কখনও শেষ হবে না।”
বাবার ভালোবাসা নিয়ে বলতে গিয়ে ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইশরাত এনি বলেন,
“আমার কাছে বাবা মানে চোখ বন্ধ করে ভরসা করার জায়গা। পৃথিবীতে ‘বাবা’ শব্দের পরিপূরক শুধু বাবাই।
আমার কাছে বাবা হলো আস্থা, আবেগ এবং আমার পুরো পৃথিবী। বাবা শব্দটির সঙ্গে ত্যাগ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি সারাজীবন ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে আমাদের ভালো থাকা নিশ্চিত করেন।
এই মানুষটিকে আমরা কখনও মুখ ফুটে ভালোবাসার কথা বলতে পারি না, অথচ আমরা সবাই বাবাকে অসম্ভব ভালোবাসি। আমার কাছে আমার বাবা আমার পুরো পৃথিবী। আমি সবকিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে তাকে ভালোবাসি।
তাকে ভালোবাসি বলার জন্য কোনো বিশেষ দিনের প্রয়োজন হয় না। তবে বাবা দিবসে পৃথিবীর সব বাবার প্রতি রইল আমার গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। পৃথিবীর সব বাবা সুস্থ থাকুন। আবারও বলতে চাই—ভালোবাসি বাবা।”
বাবাকে কিছুটা সাহিত্যিক ভাষায় তুলে ধরেছেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী লিমন শেখ।
তিনি বলেন,
“আমি দেখেছি একজন বাবাকে, যিনি নিজের তপ্ত যৌবনের সব রঙিন পৃষ্ঠা ছিঁড়ে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য একটি রঙিন উপন্যাসের জন্ম দিয়েছেন। ভাঙা চশমার ফ্রেম আর বিবর্ণ শার্টের আড়ালে তিনি সযত্নে লুকিয়ে রাখতেন এক বুক অভিমান।
সংসারের কর্কশ ক্যানভাসে তিনি ছিলেন এক নিঃশব্দ চিত্রকর, যিনি নিজের সবটুকু রক্ত নিংড়ে অন্যের জীবনে রঙের উৎসব এঁকে গেছেন।
ক্লান্তির চরম সীমায় পৌঁছেও যার জীবনে বিশ্রামের কোনো স্থান ছিল না। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রখর রোদ উপেক্ষা করে যিনি মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন। নিজের ক্ষুধাকে চাপা দিয়ে যিনি পরিবারের জন্য আহার জোগাড় করেছেন।
আমি দেখেছি একজন বাবাকে, পাওনাদারের তীক্ষ্ণ কথায় যার মেরুদণ্ড নুয়ে পড়েছে, অথচ পরিবারের সামনে এসে যিনি আবার হিমালয়ের মতো দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
সমাজের সব অবহেলা, গ্লানি আর অপমান নিজের বুকে ধারণ করে তিনি আমাদের জন্য তৈরি করেছেন নিরাপদ আশ্রয়।
গভীর রাতে যখন পুরো শহর ঘুমিয়ে থাকে, তখন তাকে দেখা যায় জীর্ণ ডায়েরির পাতায় দেনা-পাওনার হিসাব মেলাতে। কপালের বলিরেখায় জমে থাকে দুশ্চিন্তা, আর তামাকের ধোঁয়ায় উড়ে যায় কিছু অপূর্ণ স্বপ্ন।
আমি দেখেছি, প্রচণ্ড জ্বরে শরীর পুড়লেও তিনি ভোরবেলা জীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছেন।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তিনি কোনো প্রতিদান চাননি। বার্ধক্যের কাঁপা হাতে, ঝাপসা চোখেও ছিল সন্তানের সাফল্যের জন্য এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা।
নিজেকে মোমের মতো গলিয়ে যিনি পরিবারকে আলো দিয়েছেন, অথচ নিজে রয়ে গেছেন অন্ধকারে।
বাবা, তুমি কি জানো? আজ তোমার চরিত্রেই অভিনয় করছি আমি। এখন আর আগের মতো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া হয় না। নিজের লোভ-লালসাগুলো বিসর্জন দিতে শিখেছি। কষ্টগুলো আর তেমন কিছু মনে হয় না, কারণ বুকটা আজ তোমার মতোই পাথরে বাঁধানো। এখন আমিও জানি, শুধু আবেগ দিয়ে জীবন চলে না। বাস্তবতার কঠোর আঘাতে বারবার বিদ্ধ হচ্ছি। পিতৃত্ব আমাকেও গ্রাস করছে। তুমি বলতে, পিতৃত্বে কষ্ট নেই; তবে সুখে ছিলাম কবে?”
বাবাকে নিয়ে এমন হাজারো স্মৃতি, গল্প কিংবা উপন্যাস লেখা সম্ভব। আবার অনেক বাবা সন্তানের অবহেলায় আশ্রয় নেন বৃদ্ধাশ্রমে কিংবা কাটান জীবনের শেষ সময় রাস্তায়।
বিশ্ব বাবা দিবসে প্রত্যাশা একটাই—পৃথিবীর সব বাবা ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক, আর প্রতিটি সন্তানের হৃদয়ে বেঁচে থাকুক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রতীক হয়ে।
প্রকাশক: মোঃ শরিফুল ইসলাম। যোগাযোগ: মেডিকেল পূর্ব গেট, বুড়িরহাট রোড, রংপুর, বাংলাদেশ।
Copyright © 2026 RCTV ONLINE. All rights reserved.