দেশের স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তিনি বলেছেন, সারা দেশে ২০টি নতুন হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে নারীদের জন্য দুটি ১ হাজার ৫০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ঘরে ঘরে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, যার মধ্যে ৮০ হাজারই হবেন নারী।
রোববার (১৪ জুন) সকালে নারায়ণগঞ্জ সরকারি (ভিক্টোরিয়া) জেনারেল হাসপাতাল থেকে একযোগে ১০টি জেলার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিল আরও ৯টি জেলা সদর হাসপাতাল।
অনুষ্ঠানের আগে নির্ধারিত সময়ের প্রায় আধা ঘণ্টা পূর্বে হাসপাতালে আকস্মিক পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ সময় তিনি চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি যাচাই করেন। উপস্থিতির তালিকা হাতে নিয়ে একে একে নাম ধরে ডাকেন এবং বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন। কয়েকজনের অনুপস্থিতি ও প্রশাসনিক অসঙ্গতি নজরে এলে অসন্তোষ প্রকাশ করে দায়িত্বে অবহেলার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন।
পরিদর্শনকালে তিনি হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার মান, পরিচ্ছন্নতা, রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের বিষয় খতিয়ে দেখেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসঙ্গতি দেখতে পেয়ে সংশ্লিষ্টদের আরও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দেন।
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, আমরা সবাই একটি পরিবার। জনগণের সেবার দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর অবহেলা সহ্য করা হবে না। অতীতের মতো দায়িত্বহীনতা আর চলবে না। হাসপাতালের শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা ও সেবার মান নিশ্চিত করতে হবে, অন্যথায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের স্বাস্থ্য খাত নানা সংকটে জর্জরিত ছিল। হাম রোগের প্রাদুর্ভাব, টিকার ঘাটতি, যক্ষ্মা ও জলাতঙ্ক প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবসহ একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। তবে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপে পর্যাপ্ত হামের টিকা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে এবং দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির ১ দশমিক ২ শতাংশ বরাদ্দ দিয়ে ৬৯ হাজার কোটি টাকার বাজেট রাখা হয়েছে। এই অর্থ জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ব্যয় করা হবে। ইতোমধ্যে দেশের ১০টি জেলায় নতুন আইসিইউ ইউনিট চালু করা হয়েছে, যাতে সামান্য শ্বাসকষ্ট বা জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য রোগীদের রাজধানীমুখী হতে না হয়।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরনের সংস্কারের অংশ হিসেবে সারা দেশে ২০টি হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে নারীদের জন্য দুটি ১ হাজার ৫০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল থাকবে। বাকি ১৮টি হাসপাতাল হবে ১ হাজার শয্যার। এসব হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস, স্তন ও জরায়ু ক্যান্সারের চিকিৎসা, পঙ্গুত্ব পুনর্বাসন, মাতৃসেবা এবং সাধারণ চিকিৎসার আধুনিক সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, প্রতিটি হাসপাতালে অত্যাধুনিক পাঁচটি করে অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হবে এবং জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য চারটি হেলিকপ্টার সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ঘরে ঘরে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। এর মধ্যে ৮০ হাজার হবেন নারী। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্ক্রিনিং এবং প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা প্রদান করবেন। সরকারের লক্ষ্য মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া।
পরিদর্শনের সময় ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি জেলা সিভিল সার্জনকে উদ্দেশ করে বলেন, বাংলাদেশের অনেক হাসপাতাল ঘুরেছি। অন্তত মন্ত্রী আসবে জেনেও আপনারা হাসপাতাল পরিষ্কার রাখেননি। রান্নাঘরের পুরোনো ও অচল সরঞ্জাম, দাহ্য পদার্থ এবং রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ জিনিসপত্র অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, তিন মাস সময় দিয়েছি। এখন আর অজুহাত নয়। আগামী তিন দিনের মধ্যে হাসপাতালের পরিবেশ ও শৃঙ্খলায় দৃশ্যমান পরিবর্তন না হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, শুধু হাসপাতাল প্রস্তুত রাখলেই হবে না, পুরো শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
অনুষ্ঠানের শেষে ১০টি জেলার আইসিইউ ইউনিটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করে তিনি বলেন, রোগীদের অযথা রেফার না করে স্থানীয় পর্যায়েই সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা সবাই একটি পরিবার। জনগণের সেবায় যার যা প্রয়োজন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. আবুল কালাম, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ, নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান মাশুকুল ইসলাম রাজীব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির, জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী এবং জেলা সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফজল মুহাম্মদ মুশিউর রহমান।
প্রকাশক: মোঃ শরিফুল ইসলাম। যোগাযোগ: মেডিকেল পূর্ব গেট, বুড়িরহাট রোড, রংপুর, বাংলাদেশ।
Copyright © 2026 RCTV ONLINE. All rights reserved.