
গাইবান্ধা শহরের পশ্চিমপাড়া এলাকার একটি ছিমছাম বাড়ি। বাইরে থেকে আর দশটা সাধারণ বাড়ির মতো মনে হলেও, এর ভেতরের চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন। শোবার ঘরের চেনা আসবাবপত্রের বদলে এখানে ঠাঁই পেয়েছে হারিয়ে যাওয়া অতীত আর ইতিহাসের নানা উপাদান। নিজের তীব্র শখ আর প্রবল জেদ থেকে নিজ বাড়িতেই এই অনন্য সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন ওয়াজেদ হোসেন জীম নামে এক তরুণ।
জীমের এই ‘মিনি মিউজিয়ামে’ পা রাখলেই মনে হবে টাইম মেশিনে চড়ে দর্শক চলে গেছেন কয়েক দশক কিংবা শতাব্দী প্রাচীন কোনো যুগে। এখানে পরম মমতায় সংরক্ষিত আছে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দুর্লভ মুদ্রা, প্রাচীন হ্যারিকেন, কুপি বাতি, গ্রামোফোন, অ্যানালগ ক্যামেরা, ক্যাসেট প্লেয়ার এবং ল্যান্ডফোন সেট। শুধু তাই নয়, গ্রামীণ জনপদে ব্যবহৃত কাঠ, লোহা ও মাটির তৈরি নানা তৈজসপত্রের পাশাপাশি স্থান পেয়েছে গুণীজনদের ব্যবহৃত চশমা, কলম ও ঘড়ির মতো নানা নান্দনিক স্মৃতিস্মারক।
সংগ্রাহক ওয়াজেদ হোসেন জীম তাঁর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ সম্পর্কে বলেন, ছোটবেলা থেকেই পুরোনো জিনিসপত্রের প্রতি আমার একটা অন্যরকম টান ছিল। কোথাও কোনো ফেলে দেওয়া ঐতিহাসিক জিনিস দেখলেই আমি তা সংগ্রহ করতাম। নিজের জমানো টাকা আর অক্লান্ত পরিশ্রমে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ঘুরে এগুলো সংগ্রহ করেছি। আমি চাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বইয়ের পাতার পাশাপাশি বাস্তবেও এসব দেখুক।
শুরুতে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টিকে 'বাজে খরচ' বা ঝামেলা মনে করলেও, জীমের একাগ্রতা আজ সবাইকে মুগ্ধ করেছে। জীমের বাবা এ টি এম ওবাইদুর রহমান জানান, প্রথম দিকে ও যখন এগুলো টাকা দিয়ে কিনে আনত, আমরা একটু বিরক্তই হতাম। কিন্তু এখন যখন দেখি প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ, বিশেষ করে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা এগুলো দেখতে আমাদের বাড়িতে ভিড় করছে, তখন খুব ভালো লাগে। আমরা এখন ওকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করি। একই রকম গর্ব প্রকাশ করে জীমের স্ত্রী মাকসুদা ইশরাত মিম বলেন, সংসারের জায়গার চেয়ে ঘরের মধ্যে এসব জিনিসের সংখ্যাই বেশি। প্রথমে একটু কষ্ট হলেও, এখন মানুষের আগ্রহ আর ভালোবাসা দেখে আমাদেরও খুব গর্ব হয়। ওর এই কাজের সম্মান এখন পুরো পরিবারের।
বর্তমানে এই মিনি মিউজিয়ামে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ভিড় করছেন ইতিহাসপ্রেমী ও সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীরা আসছেন বইয়ের পাতায় পড়া অতীতকে চোখের সামনে ছুঁয়ে দেখতে। সম্প্রতি এই অনন্য সংগ্রহশালাটি পরিদর্শনে আসেন গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী ও বিশিষ্ট উন্নয়ন গবেষক এম, আবদুস্ সালামসহ স্থানীয় গুণীজনেরা। তাঁরা জীমের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং আগ্রহ নিয়ে সংগ্রহশালার প্রতিটি উপাদান ঘুরে দেখেন। এম, আবদুস্ সালাম জানান, জীমের সংগ্রহ সত্যিই অসাধারণ; শোবার ঘর থেকে ড্রয়িং রুম—সব স্থানেই ইতিহাস ও ঐতিহ্যের চিহ্ন।
ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলা এই সংগ্রহশালাকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চান জীম। সরকারি কিংবা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে একটি পূর্ণাঙ্গ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন তাঁর, যাতে করে গৌরবময় অতীতকে খুব কাছ থেকে জানতে ও শিখতে পারে নতুন প্রজন্ম।
প্রকাশক: মোঃ শরিফুল ইসলাম। যোগাযোগ: মেডিকেল পূর্ব গেট, বুড়িরহাট রোড, রংপুর, বাংলাদেশ।
Copyright © 2026 RCTV ONLINE. All rights reserved.