কৃষি প্রধান জেলা নীলফামারী চড়া দামে সার-সেচ-শ্রম দিয়ে ফসল ফলাতে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও সে অনুপাতে ধানের দাম না পাওয়া তারা ব্যাপক লোকসানে পড়ছেন বলে তাদের অভিযোগ। বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেলেও ধানের দাম নিম্নমুখি হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষক।
জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, মাঠগুলোতে এখন ধান কাটতে কৃষকরা বেস্ততা সময় পার করছে। দিগন্ত জোড়া ফসলের মাঠ। বাতাসে দোল খাচ্ছে বোরোর সোনালি শীষ। সোনালি ধান কাটায় ব্যস্ত কৃষকরা। কেউ আঁটি বেঁধে ধানের বোঝা কাঁধে নিয়, কেউ ভ্যানে করে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন ধান।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, চলতি মৌসুমে ৮১ হাজার ৮৫৯ হেক্টর জমিতে বোরো ধান লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৯০১ মেট্রিক টন চাউল। এ পর্যন্ত মোট আবাদী জমির মধ্যে ১০ ভাগ ধান কাটা শুরু হয়েছে।
চওড়া বড়গাছা ইউনিয়নের মিজানুর রহমান নামে এক কৃষক বলেন, দেশে সব জিনিসপত্র দাম যে হারে বাড়ছে সে হারে কৃষকের লাগানো জিনিসের দাম নাই। এবার ৩ একর জমিতে আলু লাগিয়েছিলাম আলুতে লজ হয়েছে। এখনো আলু বিক্রি করতে পারি নাই। বর্তমান বাজারে আলুর কেজি ৫/৬ টাকা। বাড়ীতে অধিকাংশ আলু নষ্ট হচ্ছে। আলুর বিক্রি পাইকার পাওয়া যাচ্ছে না।
কিসামত ভুটিয়ান এলাকার কৃষক আব্দুল জলিল হোসেন বলেন, দুই বিঘা জমি ধান লাগিয়েছি। ধান চাষে লাভ কম। দুই বিঘা ধান চাষে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার টাকা বিক্রি হবে ২৫ হাজার টাকা। ধানের দাম যদি বাড়তো তাহলে ধান চাষে পোষাতো। ধানের বাজার খারাপ। এ বাজারে ধান চাষ করে লাভ নাই। ধানের চাইতে ভুট্টায় লাভ বেশি। আগামীতে ধান নালাগে ভুট্টা চাষ করবো। কৃষকের লাগানো মরিচ, পিয়াজ, রসুন, আলুসহ কৃষকের জিনিসের দাম নেই।
নীলফামারীর লক্ষীচাপ নিমতলী এলাকার ধান চাষি ললিত চন্দ্র রায় জানান, এবছর ধানের ফলন ভালো হয়েছে। জমি অনুযায়ী এক বিঘা (৩০ শতাংশে) প্রতি ১৫ থেকে ২০ মণ ধান পাওয়া যাবে। আবার কোনো মাঠে বিঘাপ্রতি ২২ মণ ধান পেয়েছে কৃষক। এবছর আবহাওয়া অনুকূলে ছিল এবং পোকার আক্রমণও ছিল তুলনামূলক কম। ধানের দাম কম হওয়ায় কৃষকের হিসাব করলে লজ হবে।
শহরের মানিকের মোড় এলাকার কৃষক রজব আলী জানান, দিন দিন বাড়তি হচ্ছে বিদ্যুতের দাম। বাড়ছে সার, কীটনাশক এবং শ্রমিকের মজুরি। সব মিলে দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে চাষাবাদের উৎপাদন খরচ। ধান চাষে লোকসান হলে কৃষকের চাষাবাদ করা বন্ধ করে দিবে।
মীরগঞ্জ হাটে গিয়ে দেখা যায় ১ সপ্তাহ আগে প্রতি মণ হাইব্রিড জাতের ধান বিক্রি হয়েছে এক হাজার টাকা মণ। এবং এক সপ্তাহ পর নতুন ধান বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৭শ থেকে ৮শ টাকা মণ। চাষিরা বলছেন এই দামে ধান বিক্রি করে লাভ হবে না। নিরুপায় হয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে।
পলাশবাড়ী ইউনিয়ন কৃষকদলের সভাপতি মো কাফি মিয়া বলেন, বিঘা জমিতে সেচের পানি নিতে লাগছে তিন হাজার টাকা। এতে কৃষকেরা ধান আবাদ করে লাভবান হতে পারছে না। কারণ সার ওষুধ সব জিনিসের দাম বেশি। কিন্তু ধানের দাম কম। ধান পরিচর্যা, কাটা শ্রমিকের মজুরি, মাড়াই ও পরিবহনসহ অন্য সব ধরনের খরচও বাড়তি। কয়েক দফায় সবকিছুর দাম বাড়লেও ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না কৃষকরা।
নীলফামারী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আতিক হাসান বলেন, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন হয়েছে ভালো। পোকা-মাকড়ের আক্রমণ ছিল কম, ফলে কীটনাশকের ব্যবহার লেগেছে অল্প। এখন পর্যন্ত সদরে ১৫ ভাগ ধান কৃষকের ঘরে উঠেছে। এই মাসের মধ্যেই বাকি ধানগুলো কাটা শেষ হতে পারে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুর রহমান বলেন, সরকার ধানের যে দাম দিয়েছে সে রেটে ধান কেনা শুরু হয়নি, তাই হয়তোবা দাম কম। এ চলতি মৌসুমে জেলায় ধানের চাষ হয়েছে ৮১ হাজার ৮৫৯ হেক্টর।
তিনি আরও বলেন, জেলায় কৃষি শ্রমিকের পাশাপাশি কৃষি বিভাগের ৭৮টি কম্বাইন হারভেস্টার মিশিন দিয়ে ধান কাটতে কৃষকদের সহযোগিতা করছে। এখন পর্যন্ত আবহাওয়া ভালো থাকায় কৃষক সুন্দরভাবে ধান কাটতে পারছে।
প্রকাশক: মোঃ শরিফুল ইসলাম। যোগাযোগ: মেডিকেল পূর্ব গেট, বুড়িরহাট রোড, রংপুর, বাংলাদেশ।
Copyright © 2026 RCTV ONLINE. All rights reserved.