
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার হোসেনগাঁও ইউনিয়নের কলিগাঁও গ্রামের আশির উদ্দিন। জন্ম থেকেই দুই পা অকেজো। স্বাভাবিকভাবে হাঁটা কিংবা অন্যদের মতো ছুটে চলা তার জীবনে কখনো সম্ভব হয়নি। কিন্তু শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।
অদম্য ইচ্ছাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও কঠোর পরিশ্রমে তিনি আজ হয়ে উঠেছেন এলাকার মানুষের আস্থার প্রতীক।
দেড় যুগ ধরে হোসেনগাঁও ইউনিয়ন পরিষদে উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন আশির উদ্দিন। প্রতিদিন ইউনিয়নের অসংখ্য মানুষ তার কাছে আসেন জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদ, অনলাইন আবেদন, সরকারি ফরম পূরণসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা নিতে। মানুষের দেওয়া সামান্য সম্মানীতেই চলে তার পাঁচ সদস্যের সংসার।
আশির উদ্দিন কলিগাঁও গ্রামের মাতিন ও সাজিরুন দম্পতির ছয় সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। দুই পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে না পারলেও বিশেষ ধরনের জুতা ও দুই হাতের সাহায্যে চলাফেরা করেন তিনি। আগে কোথাও যেতে হলে অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হতো। বর্তমানে একটি ব্যাটারিচালিত তিন চাকার মোটরসাইকেল ব্যবহার করে প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াত করেন। তবে পুরোনো গাড়িটি প্রায়ই নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
আশির উদ্দিন বলেন, “ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি আমার প্রবল আগ্রহ ছিল। হোসেনগাঁও ইউনিয়নের মুন্সি আব্দুল জব্বার দাখিল মাদরাসা থেকে দাখিল পাস করার পর হরিপুর উপজেলার কাঠালডাঙ্গীর একটি কৃষি ডিপ্লোমা কলেজ থেকে কৃষিতে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করি। ছাত্রজীবনে টিউশনি করিয়ে পড়াশোনার খরচ চালিয়েছি। পাশাপাশি কম্পিউটার প্রশিক্ষণও নিয়েছি। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে গত ১৫ বছর ধরে ইউনিয়ন পরিষদে অনলাইন সেবা দিয়ে আসছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমি শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হলেও কখনো নিজেকে অসহায় ভাবিনি। জীবনে অনেক কষ্ট ও সংগ্রাম করতে হয়েছে। এখন মানুষের সেবা করতে পারছি, এটিই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ। তবে পরিবার নিয়ে চলতে এখনও অনেক কষ্ট হয়। সরকারি সহায়তা পেলে আরও ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারব।
হোসেনগাঁও ইউনিয়নে সেবা নিতে আসা রফিকুল, লিমা ও খাদেমুল বলেন, “শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও আশির উদ্দিন সমাজের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। অনেকেই যেখানে হতাশ হয়ে পড়ে, সেখানে তিনি শিক্ষাকে শক্তি হিসেবে কাজে লাগিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের অনলাইন সেবা দিয়ে তিনি এলাকাবাসীর আস্থা অর্জন করেছেন।”
হোসেনগাঁও ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান হেদায়েতুল্লাহ বলেন, “জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জীবনযাপন করলেও আশির উদ্দিন কখনো নিজেকে দুর্বল ভাবেননি। অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে ইউনিয়নের মানুষের বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তার কর্মস্পৃহা অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণা।”
রাণীশংকৈল উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বলেন, “আশির উদ্দিন প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সমাজসেবা অফিস থেকে তিনি প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। এছাড়া সমাজসেবা অধিদপ্তরের ঋণ সুবিধা নিয়ে সেই অর্থ কাজে লাগিয়ে তিনি আত্মনির্ভরশীল হয়েছেন। কয়েক বছর আগে তার এই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে শ্রেষ্ঠ উদ্যোক্তা পুরস্কারও দেওয়া হয়েছে।”
প্রতিকূলতাকে জয় করে আশির উদ্দিন আজ প্রমাণ করেছেন—শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, মানুষের প্রকৃত শক্তি তার মনোবল ও আত্মবিশ্বাসে। তার জীবনসংগ্রাম এখন পুরো এলাকার জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম।
প্রকাশক: মোঃ শরিফুল ইসলাম। যোগাযোগ: মেডিকেল পূর্ব গেট, বুড়িরহাট রোড, রংপুর, বাংলাদেশ।
Copyright © 2026 RCTV ONLINE. All rights reserved.