যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিরক্ষা ও গবেষণা খাতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা একের পর এক নিখোঁজ ও মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এগুলো একই সময়ে ঘটা এবং প্রায় সবারই প্রতিরক্ষা বা উচ্চতর বিজ্ঞানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকায় নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে মার্কিন প্রশাসনে। যদিও তদন্তকারীরা এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাননি, তবুও হোয়াইট হাউসের এই তদন্ত এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে, তারা অন্তত ১০ মার্কিন বিজ্ঞানীর রহস্যজনক নিখোঁজ এবং মৃত্যুর খবরের তদন্ত করছে। তাদের অনেকেরই পারমাণবিক বা অ্যারোস্পেস (মহাকাশ গবেষণা) সংক্রান্ত অত্যন্ত গোপনীয় তথ্যে প্রবেশাধিকার ছিল। খবর ফক্স নিউজ
বুধবার (১৫ এপ্রিল) এক সংবাদ সম্মেলনে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এই ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে উদ্বেগের কথা জানান।
লেভিট উল্লেখ করেন, যদিও তিনি এখনো সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেননি, তবে প্রশাসন এই ধরনটিকে যথেষ্ট গুরুতর বলে মনে করছে এবং একটি আনুষ্ঠানিক তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার কথা ভাবছে।
কীভাবে হারাচ্ছেন?
অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ফোর্স মেজর জেনারেল উইলিয়াম ম্যাককাসল্যান্ড, যিনি অত্যন্ত গোপনীয় গবেষণা কার্যক্রম তদারকি করতেন, গত ফেব্রুয়ারিতে নিজের বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছেন।
সুসান উইলকারসন মাত্র এক ঘণ্টার জন্য বাইরে ছিলেন, আর এই সময়ের মধ্যেই তার স্বামী, অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ফোর্স মেজর জেনারেল উইলিয়াম ‘নিল’ ম্যাককাসল্যান্ড তাদের নিউ মেক্সিকোর আলবুকার্কের বাড়ি থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন। ম্যাককাসল্যান্ড এক সময় মার্কিন সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে আধুনিক এবং অতি-গোপনীয় গবেষণা কর্মসূচিগুলো পরিচালনা করতেন।
বার্নালিলো কাউন্টি শেরিফ অফিসের তথ্যমতে, ৬৮ বছর বয়সী ম্যাককাসল্যান্ড তার ফোনটি বাড়িতে রেখে গেলেও তার মানিব্যাগ এবং একটি .৩৮ ক্যালিবার রিভলভার নিখোঁজ রয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, জেনারেল নিখোঁজ হওয়ার আগে স্মৃতিভ্রম সমস্যায় ভুগছিলেন বলে জানিয়েছিলেন। তবে কর্তৃপক্ষ জোর দিয়ে বলেছে, নিখোঁজ হওয়ার সময় তিনি বিভ্রান্ত ছিলেন এমন কোনো প্রমাণ নেই।
ম্যাককাসল্যান্ডের এই অন্তর্ধান গত তিন বছরে মার্কিন সামরিক ও সরকারি গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীদের নিখোঁজ বা মৃত্যুর ১০টি ঘটনার একটি। এই বিষয়টি এখন হোয়াইট হাউসের নজরে এসেছে এবং কর্মকর্তারা একটি সম্ভাব্য যোগসূত্র বা ‘প্যাটার্ন’ আছে কি না তা খতিয়ে দেখছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি আশা করি এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, তবে আমরা আগামী দেড় সপ্তাহের মধ্যে নিশ্চিত হতে পারব। আমি এইমাত্র এই বিষয়ের ওপর একটি বৈঠক শেষ করেছি।’
গত তিন বছরে নিখোঁজ বা মারা যাওয়া বিজ্ঞানীদের সম্পর্কে যা জানা গেছে:
নিল ম্যাককাসল্যান্ড
এয়ার ফোর্সের অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এবং এয়ার ফোর্স রিসার্চ ল্যাবরেটরির সাবেক কমান্ডার ম্যাককাসল্যান্ড মহাকাশ গবেষণা এবং তথ্য সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি নিখোঁজ হন নিল। তিনি এয়ার ফোর্স রিসার্চ ল্যাবরেটরি এবং ন্যাশনাল রিকনসেন্স অফিসের নেতৃত্বেও ছিলেন।
২০১৬ সালে উইকিলিকস কর্তৃক হিলারি ক্লিনটনের নির্বাচনী প্রচারণার চেয়ারম্যান জন পোডেস্টার ইমেল ফাঁসের ঘটনায় তার নাম উঠে এসেছিল। সেখানে সঙ্গীতশিল্পী টম ডিলঞ্জ ইউএফও সংক্রান্ত আলোচনায় ম্যাককাসল্যান্ডের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করেছিলেন। রাইট-প্যাটারসন এয়ার ফোর্স বেস, যা কি না ১৯৪৭ সালের ‘রোজওয়েল ক্র্যাশ’ (ভিনগ্রহের যান দুর্ঘটনার গুজব) সংক্রান্ত লোকগাঁথার সঙ্গে জড়িত, সেটিরও প্রধান ছিলেন তিনি।
মনিকা জাসিন্টো রেজা
গত বছরের ২২ জুন ৬০ বছর বয়সী রেজা লস অ্যাঞ্জেলেসের কাছে একটি জঙ্গলে হাইকিং করার সময় নিখোঁজ হন। তার বন্ধু জানান, রেজা তার মাত্র ৩০ ফুট সামনে ছিলেন। একবার হাত নেড়ে হাসিমুখে সম্মতি জানানোর কয়েক মুহূর্ত পরই তিনি অদৃশ্য হয়ে যান।
রেজা একজন দক্ষ অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন এবং নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরিতে কর্মরত ছিলেন। তিনি ‘মন্ডালয়’ নামক একটি বিশেষ সংকর ধাতু উদ্ভাবন করেছিলেন, যা রকেট ইঞ্জিনের চরম তাপ সহ্য করতে পারে।
স্টিভেন গার্সিয়া
৪৮ বছর বয়সী গার্সিয়া আলবুকার্কের বাড়ি থেকে হাতে একটি পিস্তল নিয়ে হেঁটে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েন। গত বছরের ২৮ আগস্ট তিনি তার ফোন, মানিব্যাগ ও গাড়ি ফেলে হারিয়ে যান। গার্সিয়া কানসাস সিটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি ক্যাম্পাসের একজন ঠিকাদার ছিলেন, যা মার্কিন পারমাণবিক অস্ত্রের অ-পারমাণবিক যন্ত্রাংশ তৈরির প্রধান কেন্দ্র।
অ্যান্থনি চাভেজ
লস আলামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির ৭৮ বছর বয়সী সাবেক এই কর্মী মে মাসে নিখোঁজ হন। তার মানিব্যাগ ও চাবি ঘরে থাকলেও গাড়িটি ড্রাইভওয়েতে লক করা অবস্থায় পাওয়া যায়।
কার্ল গ্রিলমায়ার
ক্যালটেক-এর এই জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী তার ক্যালিফোর্নিয়ার বাড়ির সামনে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি গুলিতে নিহত হন। তিনি হাবল এবং স্পিটজার স্পেস টেলিস্কোপের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাসা মিশনে কাজ করেছেন। তার মৃত্যুর ঘটনায় ২৯ বছর বয়সী এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নুনো লুরেইরো
ম্যাসাচুসেট্স ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) এই বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর নিজ বাড়িতে গুলিতে নিহত হন। তিনি ফিউশন শক্তি গবেষণার একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তার খুনি একজন সাবেক সহপাঠী ছিল, যিনি পরে আত্মহত্যা করেন।
ফ্রাঙ্ক মাইওয়াল্ড
নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির এই প্রকৌশলী ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসে মারা যান। তার মৃত্যুর কারণ প্রকাশ করা হয়নি এবং কোনো ময়নাতদন্তও করা হয়নি। তিনি ভিনগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব সন্ধানের জন্য রাসায়নিক সংকেত শনাক্তকারী যন্ত্র তৈরি করতেন।
মেলিসা কাসিয়াস
লস আলামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির এই প্রশাসনিক কর্মকর্তা গত বছরের ২৬ জুন নিউ মেক্সিকোর টাওস কাউন্টি থেকে নিখোঁজ হন। তার গাড়ি এবং মানিব্যাগ পাওয়া গেলেও ব্যক্তিগত ও অফিসের ফোনগুলো ‘ফ্যাক্টরি রিসেট’ বা ডেটা মুছে ফেলা অবস্থায় পাওয়া গেছে।
জেসন থমাস
ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি নোভাটিসের এই সহযোগী পরিচালক ডিসেম্বর মাসে নিখোঁজ হন। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে একটি বরফ জমা হ্রদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি রাসায়নিক জীববিদ্যা বা কেমিক্যাল বায়োলজি নিয়ে কাজ করতেন।
এছাড়াও নাসা-র জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির গবেষণা বিজ্ঞানী মাইকেল ডেভিড হিকস, যিনি ‘ডার্ট প্রজেক্ট’ এবং ‘ডিপ স্পেস ১’ মিশনে কাজ করেছিলেন; ২০২৩ সালের জুলাই মাসে মারা যান। তার মৃত্যুর কারণও জনসমক্ষে আনা হয়নি।
নিখোঁজ হওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর মৃত্যু জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে। এই ঘটনাগুলো এমন এক সময়ে ঘটছে যখন হোয়াইট হাউস নাসা এবং পেন্টাগনকে পারমাণবিক মহাকাশ চুল্লি তৈরির কাজ ত্বরান্বিত করার নতুন নির্দেশ দিয়েছে।
একটি সমন্বিত তদন্তের জন্য সিনেটের চাপও বাড়ছে। প্রতিনিধি এরিক বার্লিসন আনুষ্ঠানিকভাবে এফবিআই-এর হস্তক্ষেপের অনুরোধ করেছেন। তিনি জানান, উন্নত গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এই নিখোঁজের হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
কর্তৃপক্ষ প্রতিটি মামলা আলাদাভাবে তদন্ত করলেও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা লক্ষ্য করেছেন, নিখোঁজ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অনেকেই তাদের ফোন এবং মানিব্যাগের মতো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ফেলে গেছেন। এর ফলে জাতীয় নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নিয়োজিত ব্যক্তিদের ওপর পরিকল্পিত হামলা বা নিরাপত্তা লঙ্ঘনের সম্ভাবনা নিয়ে নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়েছে।
প্রকাশক: মোঃ শরিফুল ইসলাম। যোগাযোগ: মেডিকেল পূর্ব গেট, বুড়িরহাট রোড, রংপুর, বাংলাদেশ।
Copyright © 2026 RCTV ONLINE. All rights reserved.