
গায়ের রঙ কালো বলে টেকেনি স্বামীর সংসার। বিয়ের মাত্র ৩৪ দিনের মাথায় ভেঙে যায় সেই ঘর। এরপর আশ্রয় হয় বাপহারা মা ও ছোট ভাইয়ের সংসারে। স্বামীর ঘৃণা, শ্বশুরবাড়ির অবহেলা আর সমাজের কটূক্তিকে পেছনে ফেলে অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রমে নিজেকে গড়ে তুলেছেন নাটোরের রুবিনা খাতুন (৩৯)। একসময় যাকে ‘কালো মেয়ে’ বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হতো, আজ সেই রুবিনাই কৃষি খামার গড়ে তুলে এলাকায় হয়ে উঠেছেন একজন সফল নারী উদ্যোক্তা।
রুবিনা খাতুন নাটোর সদর উপজেলার একডালা চাঁদপুর গ্রামের মৃত আব্দুর রহমানের মেয়ে। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। ছোটবেলা থেকেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা রুবিনার জীবনে বিয়ের পরই নেমে আসে বড় ধাক্কা।
নিজের সংগ্রামী জীবনের গল্প বলতে গিয়ে রুবিনা খাতুন বলেন, “২০১২ সালের ২৯ এপ্রিল পারিবারিকভাবে মোবাইলের মাধ্যমে আমার বিয়ে হয়। কিছুদিন পর স্বামী হুমায়ুন দেশে ফিরে আসে। মাত্র ৩৪ দিন সংসার করার পর আবার সৌদি আরবে চলে যায়। এরপর শাশুড়ি ও ননদের মানসিক নির্যাতন শুরু হয়। তাদের অভিযোগ ছিল আমার গায়ের রঙ কালো। কিছুদিন পর বাবার বাড়িতে ফিরে আসি। পরে স্বামীর পাঠানো তালাকনামা পাই। তখন মা ও ছোট ভাইয়ের সংসারেই স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করি।”
তিনি বলেন, বসে থাকলে জীবন চলবে না—এই চিন্তা থেকেই কিছু একটা করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে কাপড় সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন। পরে একটি এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ব্রয়লার মুরগির খামার শুরু করেন। প্রথমবার লোকসান হলেও হাল ছাড়েননি। দ্বিতীয়বার খামার করে প্রায় ৩০ হাজার টাকা লাভ হয়। সেই লাভই তাকে নতুন করে সাহস জোগায়।
রুবিনা বলেন, “এরপর বাবার রেখে যাওয়া জমিতে কৃষি আবাদ শুরু করি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রশিক্ষণ নিয়ে দেড় বিঘা জমিতে পেয়ারা বাগান করি। বাড়ির পাশের পুকুরে মাছ চাষ শুরু করি। পরে নিজেদের জমির সঙ্গে আরও ছয় বিঘা জমি লিজ নিয়ে মোট ১৮ বিঘা জমিতে পেয়ারা, লিচু, ড্রাগন, কলা, বরই, আম, নারকেলসহ বিভিন্ন ফল ও সবজি চাষ করছি।”
তিনি আরও জানান, বর্তমানে তার খামারে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি ও কবুতর পালন করা হচ্ছে। পাশাপাশি জমিতে ভুট্টা, পেঁয়াজ, ধনিয়া ও সরিষার চাষ করছেন। কৃষির পাশাপাশি তিনি একটি রেস্টুরেন্টও পরিচালনা করছেন। এতে কয়েকজন নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানও হয়েছে।
রুবিনা বলেন, “একসময় সমাজের অনেক মানুষ আমাকে অবজ্ঞা ও অবহেলা করেছে। বলেছে আমি জীবনে কিছুই করতে পারব না। এখন সেই মানুষগুলোই আমার কাছে সহযোগিতার জন্য আসে। তখন আমার খুব ভালো লাগে। আমি তাদের বিপদ-আপদে পাশে থাকার চেষ্টা করি। আমি মনে করি নারীরাও চাইলে সবকিছু জয় করতে পারে। ঘরে বসে না থেকে নারীদের কাজের মাধ্যমে নিজেদের এগিয়ে নিতে হবে।”
রুবিনার এমন সংগ্রামী সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়েছেন এলাকার অনেক নারী-পুরুষ।
প্রতিবেশী আব্দুল হাকিম বলেন, “রুবিনা খুবই পরিশ্রমী ও সাহসী নারী। জীবনের অনেক কষ্ট সহ্য করেও তিনি হাল ছাড়েননি। এখন তার খামার দেখে এলাকার অনেক মানুষ কৃষি কাজে আগ্রহী হচ্ছে।”
প্রতিবেশী জোৎস্না বানু বলেন, “একসময় মানুষ তাকে নিয়ে অনেক কথা বলত। কিন্তু এখন সবাই তাকে সম্মান করে। তিনি আমাদের এলাকার নারীদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা।”
এলাকার বাসিন্দা সুমাইয়া শিমু বলেন, “রুবিনা আপার সাফল্য দেখে অনেক নারী এখন ঘরে বসে না থেকে কিছু করার চেষ্টা করছে। তিনি সত্যিই আমাদের জন্য উদাহরণ।”
নাটোর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নীলিমা জাহান বলেন, “রুবিনা খাতুন একজন পরিশ্রমী ও উদ্যমী নারী উদ্যোক্তা। তিনি কৃষি বিভাগের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে আধুনিক পদ্ধতিতে ফল ও সবজি চাষ করছেন। তার সফলতা অন্য নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।”
নাটোর জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রাফসান বেগম বলেন, “রুবিনা খাতুন প্রমাণ করেছেন নারীরা চাইলে সব বাধা অতিক্রম করে সফল হতে পারে। তার মতো নারীরা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।”
নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন বলেন, “রুবিনা খাতুনের সংগ্রামী জীবন ও সাফল্য সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি শুধু নিজেই স্বাবলম্বী হননি, বরং অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করছেন। এমন নারী উদ্যোক্তাদের পাশে জেলা প্রশাসন সবসময় থাকবে।”
কৃষিতে অবদান রাখায় রুবিনা খাতুন ২০২১ সালে জাতীয় কৃষি পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ২০১৮ সালে নারী খামারি হিসেবে রাষ্ট্রপতির হাত থেকে কেআইবি কৃষি পদক গ্রহণ করেন। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে জয়িতাসহ বিভিন্ন সম্মাননাও পেয়েছেন তিনি। ২০১৫ সালে একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দুই লাখ টাকা পুরস্কারও অর্জন করেন।
অবহেলা আর কটূক্তিকে শক্তিতে পরিণত করে এগিয়ে চলা রুবিনা খাতুন আজ প্রমাণ করেছেন—ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রম থাকলে প্রতিকূলতাকেও জয় করা সম্ভব। সমাজে একসময় অবহেলিত সেই ‘কালো’ মেয়েটিই এখন আলো ছড়াচ্ছেন সাফল্যের দীপ্তিতে।
প্রকাশক: মোঃ শরিফুল ইসলাম। যোগাযোগ: মেডিকেল পূর্ব গেট, বুড়িরহাট রোড, রংপুর, বাংলাদেশ।
Copyright © 2026 RCTV ONLINE. All rights reserved.