
নান্দনিক সৌন্দর্যের কারু কাজ আর স্থাপনাশৈলী এখনো অগণিত মানুষকে বিমোহিত করে চলছে ঠাকুরগাঁওয়ের দেড়শ বছরের প্রাচীন ছোট বালিয়া জামে মসজিদ। যা স্থানীয়ভাবে পরিচিত জিনের মসজিদ নামে।
ঐতিহাসিক অনিন্দ্য সুন্দর মসজিদটি ঠাকুরগাঁও জেলা শহর থেকে পনেরো কিলোমিটার দুরে ছোট বালিয়া গ্রামে অবস্থিত।
জনশ্রুতি আছে, প্রায় দেড়শ বছর আগে রাতের আঁধারে মসজিদটি নির্মাণ করেছিল অদৃশ্য এক জাতি জিন। সে সময় ওই এলাকাটি তাদের পছন্দ হয়। তবে রাত পেরিয়ে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলে কিছু কাজ অসম্পূর্ণ রেখে চলে যায় তারা।
এ দিকে এসব কথিত লোককাহিনী শুধুই গুজব বলে মনে করেন মসজিদের ইমামসহ মসজিদটি আধুনিকায়নের সঙ্গে জড়িতরা।
এলাকাবাসী ও স্থানীয় চৌধুরী পরিবারের সূত্র মতে, প্রাচীন স্থাপনা মসজিদটি আনুমানিক ১৮শ সালের শেষার্ধে বালিয়ার জমিদার মেহের বক্স চৌধুরী এই মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। পরে ভারতের দিল্লি থেকে শিল্পকুশল কারিগর এনে মসজিদ নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এতে পোড়া ইটের সঙ্গে চুন-সুরকির মর্টার ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ছাদ পর্যন্ত নির্মাণের পর হঠাৎ প্রধান মিস্ত্রির মৃত্যু হলে গম্বুজ আর করা হয়নি।
পরবর্তীতে স্থানীয় নির্মাণ শ্রমিকদের দিয়ে কাজ শুরু করা হলেও মোগল স্থাপত্যশৈলীর দুর্বোধ্য নকশায় মসজিদের ছাদ ও গম্বুজ তৈরিতে বার বার ব্যর্থ হয় তারা। এরই মধ্যে ১৯০৫ সালে মেহের বক্স চৌধুরীর মৃত্যু হয়। পরে নানা কারণে মসজিদ নির্মাণ কাজ আর এগোয়নি। ধীরে ধীরে সেই স্থানটি পরিণত হয় জঙ্গলে। ৪২ ইঞ্চি প্রসস্ত দেয়ালের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদটিতে রয়েছে ৩ গম্বুজ ও ১৬টি মিনার।
আয়তাকার এই মসজিদ উত্তর দক্ষিণে ৬৯ ফুট ২ ইঞ্চি আর পূর্ব পশ্চিমে ৬২ ফুট ৬ ইঞ্চি দীর্ঘ। সিঁড়ি প্রবেশপথ,খোলা চত্বর ও নামাজঘর এই তিনটি অংশে বিভক্ত মসজিদটি।
মেহের বক্স চৌধুরীর ষষ্ঠ প্রজন্মের বংশধর আফগান চৌধুরী বলেন, মসজিদের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে আমার চাচা সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আনছারুল হক চৌধুরী এটি পুনর্নির্মাণ কাজের উদ্যোগ নেন। পরে ২০০৫ সালে নামাজ আদায়ের উপযুক্ত করে তুলতে কাজ শুরু হয়। প্রায় পাঁচ বছর পর ২০১০ সালে মসজিদটি উদ্বোধন করা হয়। পুরনো নকশার আদলে মিল রেখে উপরে নির্মাণ করা হয়েছে তিনটি সুউচ্চ গম্বুজ।
মসজিদের ইতিহাস সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, এর আগে অর্ধনির্মিত অবস্থায় এভাবেই শত বছর ধরে পরে থাকে অসমাপ্ত এই মসজিদটি।তখন মসজিদের চারপাশ ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। ভেতরে ছিল সাপসহ বিভিন্ন পোকামাকড়। তখন ভয়ে কেউ যেত না সেখানে। এভাবে প্রায় ১৫০ বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় মসজিদটি পড়ে থাকে। এজন্য অনেকে জিনের মসজিদ বলে, যা সম্পূর্ণ গুজব।
জিনের মসজিদ নামে পরিচিতি থাকলেও মসজিদের ইমাম খোরশেদ আলম মনে করেন এর কোনো সত্যতা নেই।
মসজিদ দেখতে আসা ফেরদৌসী খানম ও রিতু আক্তার নামে দুই শিক্ষার্থী বলেন, শৈশবে বাবা-মায়ের কাছে এ জিনের মসজিদের কথা শুনে আসছেন। তখন ঢাকায় বসবাসের কারণে আসতে পারিনি। এবার ছুটি পেয়ে এসে কারুকার্য সুন্দর স্থাপনা দেখে আমরা মুগ্ধ ও বিস্মিত হচ্ছি।
এদিকে ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে এগিয়ে এসেছেন উপজেলা প্রশাসন জানিয়ে সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আবু তাহের মো. সামসুজ্জামান বলেন, মসজিদটি ইতোমধ্যে জেলার পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিণত হয়েছে। মসজিদ সংস্কারের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে থেকে অনুদানের বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। মসজিদ উন্নয়নে আরও কিছু প্রয়োজন পড়লে উপজেলা প্রশাসন তা দেখবে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।
প্রকাশক: মোঃ শরিফুল ইসলাম। যোগাযোগ: মেডিকেল পূর্ব গেট, বুড়িরহাট রোড, রংপুর, বাংলাদেশ।
Copyright © 2026 RCTV ONLINE. All rights reserved.