
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতির অজুহাত দেখিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে নাটোর জেলার বিভিন্ন জ্বালানি তেল পাম্পে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ না করার অভিযোগ উঠেছে। এতে বিপাকে পড়েছেন পরিবহন চালক, মোটরসাইকেল আরোহী ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রের মালিকরা। হঠাৎ করে সীমিত তেল সরবরাহের কারণে অনেক চালককে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরতে হচ্ছে, ফলে সময় ও অর্থ দুটিই নষ্ট হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে গিয়ে অনেক চালক তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি নিতে চাইলে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। কোথাও কোথাও পাম্প কর্তৃপক্ষ নিজেরাই সীমিত লিটার নির্ধারণ করে দিচ্ছেন। এতে দূরপাল্লার বাস-ট্রাক চালকরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন।
নাটোর শহরের একটি পাম্পে তেল নিতে আসা ট্রাকচালক আব্দুল জলিল বলেন,
“গাড়ির ট্যাংক ভরার জন্য তেল নিতে গেলে পাম্প থেকে বলা হচ্ছে সীমিত তেল দেওয়া হবে। তারা বলছে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে সরবরাহ কমে যেতে পারে। কিন্তু আমাদের তো নিয়মিত গাড়ি চালাতে হয়। মাঝপথে তেল শেষ হয়ে গেলে তখন বড় সমস্যায় পড়তে হয়।”
একটি দূরপাল্লার বাসের চালক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন,
“আমরা ২০০–৩০০ লিটার ডিজেল নিতে চাইলে পাম্প থেকে ৫০ বা ১০০ লিটারের বেশি দিচ্ছে না। তারা বলছে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তেল মজুদ রাখতে হবে। এতে আমাদের সময় নষ্ট হচ্ছে, আবার অন্য পাম্পে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।”
মোটরসাইকেল চালক রাশেদ হোসেন বলেন,
“৫০০ বা ১০০০ টাকার তেল নিতে গেলেও অনেক সময় অজুহাত দেখানো হয়। বলা হয় তেল সীমিত আছে। এতে সাধারণ মানুষ অযথা ভোগান্তিতে পড়ছে। অফিস-ব্যবসার কাজে বের হয়ে বারবার পাম্পে ঘুরতে হচ্ছে।”
জেলা পরিবহন শ্রমিক সভাপতি শরিফুল ইসলাম বুলবুল বলেন,
“কোনো সরকারি ঘোষণা ছাড়াই যদি পাম্পগুলো নিজেরা তেল সীমিত করে দেয়, তাহলে তা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এতে পরিবহন খাতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। পরিবহন চালকদের সময় নষ্ট হচ্ছে, আবার অনেক সময় গাড়ি চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।”
তবে পাম্প মালিকদের কেউ কেউ বলছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে—এই আশঙ্কা থেকেই তারা সতর্কভাবে তেল দিচ্ছেন।
নাটোর রেলস্টেশন বাজার এলাকার একটি পাম্পের মালিক বাবুল বাবু বলেন,
“আমরা কোনো সংকট তৈরি করতে চাই না। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি ও সরবরাহ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকায় অনেক সময় সবাইকে সীমিতভাবে তেল দিতে হচ্ছে। যাতে বেশি মানুষ তেল নিতে পারেন।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকটি পাম্পের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন,
“বিশ্ববাজারে অস্থিরতা চলছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতির খবরের কারণে সরবরাহে সমস্যা হতে পারে—এই আশঙ্কা থেকেই আমরা সবাইকে সীমিত তেল দিচ্ছি।”
এ বিষয়ে সচেতন নাগরিকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অজুহাতে যদি কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের দাবি জানিয়েছেন।
নাটোরের ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিক শামীম আহমেদ বলেন,
“যদি প্রকৃতপক্ষে কোনো সংকট না থাকে, তাহলে পাম্পগুলো কেন সীমিত তেল দিচ্ছে—এটা তদন্ত করা উচিত। অনেক সময় এমন পরিস্থিতিতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। প্রশাসনকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।”
এ বিষয়ে নাটোর জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আব্দুল হায়াত বলেন,
“যদি কোথাও কৃত্রিমভাবে জ্বালানি সংকট তৈরি করা হয় বা চাহিদা অনুযায়ী তেল না দেওয়া হয়—তাহলে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সচেতন মহলের দাবি, জ্বালানি তেলের বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি পাম্পগুলোতে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী স্বচ্ছভাবে জ্বালানি বিক্রি নিশ্চিত করা হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন ।
প্রকাশক: মোঃ শরিফুল ইসলাম। যোগাযোগ: মেডিকেল পূর্ব গেট, বুড়িরহাট রোড, রংপুর, বাংলাদেশ।
Copyright © 2026 RCTV ONLINE. All rights reserved.