উত্তরের শান্ত জনপদ রংপুরের মহাসড়কগুলো এখন সাধারণ মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম। প্রতিদিন ভোরে যখন জীবিকার তাগিদে মানুষ ঘর থেকে বের হয়, তখন তাদের সঙ্গী হয় এক অজানা অনিশ্চয়তা। গত ১১ মাসে এই অঞ্চলের সড়কগুলোতে দুর্ঘটনার হার এতটাই বেড়েছে যে, একে ‘মরণফাঁদ’ বললেও ভুল হবে না।
রক্তাক্ত পরিসংখ্যান
হাইওয়ে পুলিশ রংপুর রিজিয়নের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত গত ১১ মাসে এই অঞ্চলে ৪১১টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ২১৪ জন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৪৬৪ জন। আহতদের অনেকের জীবন এখন কাটছে হাসপাতালের বিছানায় কিংবা হুইলচেয়ারে।
দুর্ঘটনাজনিত কারণে এ পর্যন্ত ১৯০টি মামলা হয়েছে। অন্যদিকে, সড়ক আইন অমান্য করায় ১৪ হাজার ৭৫৮টি যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করেছে হাইওয়ে পুলিশ। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, বিপুল এই রাজস্ব কি সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে?
ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের গল্প
পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে একেকটি পরিবারের কান্না। দুই মাস আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন নাট্যকার ও ভাওয়াইয়া গবেষক আশরাফুজ্জামান বাবু। মুখে ও ঠোঁটে অসংখ্য সেলাই নিয়ে তিনি আজও সেই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের যুবক রাশেদের গল্প আরও করুণ। একসময় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। আজ একটি সড়ক দুর্ঘটনা তাকে হুইলচেয়ারে বন্দি করে দিয়েছে। নিজের বাড়িতেই তিনি আজ এক ‘বোঝা’ হয়ে দিন কাটছেন।
একই অবস্থা রংপুর নগরীর আব্দুর রহিমের। গত সেপ্টেম্বরে স্ত্রী-সন্তানসহ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে এখন ঋণের জালে জর্জরিত তিনি। চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে পরিবারটি এখন নিঃস্বপ্রায়। বাবু, রাশেদ বা রহিমের মতো এমন অসংখ্য মানুষের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠছে রংপুরের বাতাস।
কেন থামছে না এই মৃত্যুর মিছিল?
রংপুর রিজিয়নের আওতায় প্রায় ৫১১ কিলোমিটার (৩৭৩ কিমি মহাসড়ক ও ১৩৮ কিমি আঞ্চলিক সড়ক) পথ রয়েছে। হাইওয়ে পুলিশের মতে, দুর্ঘটনার মূল কারণগুলো হলো:
অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া ওভারটেকিং।
যানবাহনের ফিটনেস সংকট।
অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক।
চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব।
সড়কের কিছু অংশের নাজুক অবস্থা।
হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার আবু তোরাব মো. শামছুর রহমান বলেন, “আমরা নিয়মিত টহল, তল্লাশি এবং সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করছি। তবে সড়ক নিরাপদ করতে চালক ও পথচারী সবার সচেতনতা জরুরি।”
জাতীয় প্রেক্ষাপট: পরিস্থিতির আরও অবনতি
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। গত নভেম্বর মাসেই দেশে ৪৮৩ জন নিহত হয়েছেন। অক্টোবর মাসের তুলনায় নভেম্বর মাসে প্রাণহানি বেড়েছে ১৩.২২ শতাংশ। অধিকাংশ দুর্ঘটনাই ঘটছে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে।
উত্তরণের পথ কী?
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল জরিমানা বা মামলা দিয়ে সড়ক নিরাপদ করা সম্ভব নয়। চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং সড়কের ত্রুটি দূর করা জরুরি। সেই সাথে মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল বন্ধ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি।
রংপুরের এই মহাসড়কগুলো যেন আর কোনো পরিবারের শেষ গন্তব্য না হয়—এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের। সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই ‘মৃত্যু মিছিল’ থামানো অসম্ভব।
প্রকাশক: মোঃ শরিফুল ইসলাম। যোগাযোগ: মেডিকেল পূর্ব গেট, বুড়িরহাট রোড, রংপুর, বাংলাদেশ।
Copyright © 2026 RCTV ONLINE. All rights reserved.